ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ে আয়ারল্যান্ডের নতুন মাইলফলক

ভারতের বিপক্ষে বহুদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস লিখেছে আয়ারল্যান্ড। এর আগে এই সংস্করণে ভারতের মুখোমুখি হয়ে টানা ১১ ম্যাচে পরাজিত হয়েছিল আইরিশরা। তবে সেই হতাশার অধ্যায়ের ইতি টেনে এবার টানা দুটি ম্যাচ জিতে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে স্বাগতিক দল। বেলফাস্টে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ও শেষ টি-টোয়েন্টিতে মাত্র ১ রানের রুদ্ধশ্বাস জয় তুলে নিয়ে তারা শুধু সিরিজই নিশ্চিত করেনি, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নিজেদের অন্যতম সেরা অর্জনও যোগ করেছে ইতিহাসের পাতায়।

সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় আয়ারল্যান্ড। শুরুতে ভারতীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে রান তোলার গতি খুব বেশি বাড়াতে পারেনি স্বাগতিকরা। তবে ইনিংসের মধ্যভাগে দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেন হ্যারি টেক্টর। ধৈর্য ও পরিমিত আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সমন্বয়ে তিনি ৫৩ রানের মূল্যবান ইনিংস খেলেন। অন্যদিকে বেন কালিৎজ ৩৭ রানের কার্যকর অবদান রেখে টেক্টরকে দারুণ সঙ্গ দেন। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ১৫৪ রান সংগ্রহ করে আয়ারল্যান্ড, যা লড়াই করার মতো একটি সংগ্রহে পরিণত হয়।

১৫৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমেই ভয়াবহ ধাক্কা খায় ভারত। ইনিংসের প্রথম ওভারেই কোনো রান যোগ হওয়ার আগেই ফিরে যান দুই ওপেনার সাঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মা। এমন বিপর্যয়ের পর পাওয়ার প্লের মধ্যেই চার উইকেট হারিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই হারিয়ে ফেলে সফরকারীরা। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোয় প্রয়োজনীয় রান তোলার গতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

দলের সংকটময় মুহূর্তে একপ্রান্ত আগলে রেখে লড়াই চালিয়ে যান তিলক ভার্মা। ৪৬ বলে ৫৫ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে ভারতের আশা বাঁচিয়ে রাখলেও অন্য প্রান্ত থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন পাননি তিনি। শেষ ওভারে ভারতের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ২০ রান। ব্যাটাররা শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যান। শেষ বলে ছক্কা হাঁকিয়ে ব্যবধান কমালেও জয় থেকে মাত্র ১ রান দূরে থেমে যেতে হয় তাদের। ফলে নাটকীয় সমাপ্তির মধ্য দিয়ে ইতিহাস গড়ে মাঠ ছাড়ে আয়ারল্যান্ড।

বল হাতে আয়ারল্যান্ডের সাফল্যের অন্যতম নায়ক ছিলেন ভারতের রাজস্থানে জন্ম নেওয়া জেয় মুন্ড্রা। তিনি ৩২ রান খরচায় ৩টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে ভারতের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। শুধু এই ম্যাচেই নয়, পুরো সিরিজে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ম্যাচসেরা ও সিরিজসেরা—দুই পুরস্কারই জিতে নেন। আরেক বোলার ম্যাট হলার্ডও সমান কার্যকর ছিলেন। তিনিও ৩টি উইকেট শিকার করে ভারতের ব্যাটিং লাইনআপে বড় ধাক্কা দেন এবং জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এই সিরিজ জয় আয়ারল্যান্ডের জন্য শুধুই একটি পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়; এটি তাদের ধারাবাহিক অগ্রগতিরও প্রতীক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেললেও বড় সাফল্য খুব বেশি আসেনি। কিন্তু এবার তারা দেখিয়েছে, পরিকল্পিত বোলিং, দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং চাপের মুহূর্তে স্নায়ু ধরে রাখার সামর্থ্য থাকলে বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তিকেও হারানো সম্ভব।

অন্যদিকে ভারতের জন্য এই হার যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এই পরাজয়ের মাধ্যমে দলটির টানা ১৬টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি সিরিজে অপরাজিত থাকার ধারার অবসান ঘটেছে। শুরুতেই ব্যাটিং বিপর্যয়, বড় জুটি গড়ে তুলতে ব্যর্থতা এবং ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সুযোগ কাজে লাগাতে না পারাই শেষ পর্যন্ত তাদের হারের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বেলফাস্টের এই ম্যাচ তাই শুধু একটি রুদ্ধশ্বাস লড়াই হিসেবেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সম্ভাবনারও একটি স্মরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে। ভারতের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয় আয়ারল্যান্ডের আত্মবিশ্বাসকে যেমন নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল, তেমনি ভবিষ্যতে বড় দলগুলোর জন্যও স্পষ্ট বার্তা হয়ে রইল—আইরিশদের আর হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

মন্তব্য করুন