অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দীর্ঘ ২৩ বছর পর টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়ে প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের আগে নিজেদের প্রস্তুতি যাচাইয়ের সুযোগ পেলেও ব্যাটিংয়ে প্রত্যাশিত দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি নাজমুল হোসেন শান্তর দল। তবে ব্যাটিং বিপর্যয়ের মাঝেও অনন্য দৃঢ়তা, ধৈর্য এবং দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে অপরাজিত সেঞ্চুরি করেছেন অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। তার ব্যাটেই প্রথম ইনিংসে ৭৫.৫ ওভারে ২৬৩ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ডারউইনে অনুষ্ঠিত এই প্রস্তুতি ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। শুরু থেকেই স্বাগতিকদের বোলাররা বাড়তি বাউন্স, গতি এবং নিখুঁত লাইন-লেংথ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটারদের চাপে রাখেন। নতুন বলে বল দারুণভাবে সুইং ও বাউন্স করায় শুরু থেকেই রান তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটি স্থায়ী হতে পারেনি। দলীয় মাত্র ৭ রানে প্রথম উইকেট হারায় সফরকারীরা। ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ৮ বল খেলেও রানের খাতা খুলতে পারেননি। হ্যানো জ্যাকবসের বলে স্যাম কন্সটাসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান তিনি।
অন্য প্রান্তে সাদমান ইসলাম কিছুটা আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং করলেও ইনিংস বড় করতে ব্যর্থ হন। ৪৭ বলে ৩১ রান করে কোরি রকিচোলির শিকার হন এই বাঁহাতি ওপেনার। এরপর অভিজ্ঞ মুমিনুল হকও থিতু হতে পারেননি। ১৬ রান করে তিনিও রকিচোলির বলে বিদায় নেন।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি আসে মুশফিকুর রহিমের উইকেট হারানোর মাধ্যমে। মাত্র চার বল মোকাবিলা করে কোনো রান না করেই সাজঘরে ফেরেন এই অভিজ্ঞ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। ফলে মধ্যাহ্ন বিরতির আগেই ৭৮ রান তুলতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারিয়ে বড় চাপে পড়ে সফরকারীরা।
দ্বিতীয় সেশনে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও অমিত হাসান কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তারা ধৈর্যের সঙ্গে ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করলেও বড় জুটি গড়ে তুলতে পারেননি। অমিত ১৫ রান করে আউট হন। শান্ত ৩৭ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেললেও সেটিকে বড় স্কোরে রূপ দিতে পারেননি। পরে সৌম্য সরকারও ১৬ রান করে বিদায় নিলে বাংলাদেশের ইনিংস আবারও ধাক্কা খায়।
এমন কঠিন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেন মেহেদী হাসান মিরাজ। শুরুতে উইকেটে সময় নিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন। এরপর ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এসে আক্রমণাত্মক শট খেলতে শুরু করেন। ইনিংসের প্রয়োজন অনুযায়ী কখন রক্ষণাত্মক থাকতে হবে, আর কখন রান তোলার গতি বাড়াতে হবে—দুই ক্ষেত্রেই দারুণ পরিণত মানসিকতার পরিচয় দেন তিনি।
১৪১ বলের অনবদ্য ইনিংসে ১১টি চার ও ৪টি ছক্কার সাহায্যে অপরাজিত ১০৯ রান করেন মিরাজ। ইনিংসের শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে তিনি শুধু দলকে সম্মানজনক সংগ্রহই এনে দেননি, অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে লম্বা সময় ব্যাট করার সক্ষমতারও প্রমাণ দিয়েছেন। দলের অন্য প্রান্তে নিয়মিত উইকেট পড়লেও তিনি ধৈর্য হারাননি এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্কোর ২৬৩ রানে পৌঁছে দেন।
অস্ট্রেলিয়ার উইকেটে অতিরিক্ত বাউন্স ও গতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সব সময়ই উপমহাদেশের ব্যাটারদের জন্য বড় পরীক্ষা। সেই বিবেচনায় মিরাজের এই ইনিংস বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। তার ব্যাটিংয়ে ছিল আত্মবিশ্বাস, সঠিক শট নির্বাচন এবং দীর্ঘ সময় ক্রিজে থাকার মানসিক দৃঢ়তা—যা মূল টেস্ট সিরিজের আগে দলের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বল হাতে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের সবচেয়ে সফল বোলার ছিলেন অফস্পিনার কোরি রকিচোলি। ২৮ বছর বয়সী এই স্পিনার একাই ৬টি উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে বড় ধস নামান। বাকি চারটি উইকেট ভাগ করে নেন দলের আরও চার বোলার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বোলারদের কেউই এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেননি। তবুও তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ বোলিং, ধারাবাহিক লাইন-লেংথ এবং কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাটারদের স্বস্তিতে খেলতে দেননি।
প্রস্তুতি ম্যাচের ফলাফল মূল সিরিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ না হলেও এমন ম্যাচে খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফিটনেস, কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে সফল হতে হলে নতুন বল সামলানোর দক্ষতা, টপ অর্ডারের দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং দীর্ঘ সময় ক্রিজে থাকার মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রস্তুতি ম্যাচ বাংলাদেশের জন্য তাই একই সঙ্গে সতর্কবার্তা এবং আশার বার্তা নিয়ে এসেছে। একদিকে শীর্ষ ও মধ্যক্রমের ব্যাটিং ব্যর্থতা টিম ম্যানেজমেন্টকে ভাবাবে, অন্যদিকে মেহেদী হাসান মিরাজের দুর্দান্ত শতক প্রমাণ করেছে যে কঠিন কন্ডিশনেও বাংলাদেশের ব্যাটাররা বড় ইনিংস খেলতে সক্ষম। এখন মূল টেস্ট সিরিজের আগে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা কাটিয়ে আরও ধারাবাহিক ও আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স গড়ে তোলাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।