বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে ঘিরে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বিরোধ এবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সাবেক বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর কাছে ১৪ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন, চলমান বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিসিবির জন্য আইসিসির আর্থিক সহায়তা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হোক। বিষয়টি প্রকাশ করেছে ক্রিকবাজ।
ক্রিকবাজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাঠানো ওই চিঠিতে আমিনুল ইসলাম দাবি করেন, তাকে বিসিবির সভাপতির পদ থেকে অপসারণ এবং পরবর্তীতে নতুন বোর্ড গঠনের পুরো প্রক্রিয়া আইনগত ও প্রশাসনিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত বিধি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ কারণে তিনি নিজেকে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন এবং একই সঙ্গে আইসিসিকে আহ্বান জানিয়েছেন, বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে কোনো ধরনের অর্থায়ন না করতে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিসি চিঠিটি পাওয়ার পর বিষয়টি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে অবহিত করে। এরপর বিসিবি তাদের আইনজীবী দলের সঙ্গে আলোচনা করে আইসিসির কাছে আনুষ্ঠানিক জবাব পাঠিয়েছে। তবে সেই জবাবের বিষয়বস্তু এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে আইসিসির কাছে উভয় পক্ষের অবস্থানই এখন বিবেচনায় রয়েছে।
এ বিষয়ে আমিনুল ইসলামের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ক্রিকবাজ জানিয়েছে, তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনকলের জবাব দেননি এবং পাঠানো বার্তারও উত্তর দেননি।
বর্তমান সংকটের সূত্রপাত কয়েক মাস আগে। গত ৭ এপ্রিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আমিনুল ইসলাম নেতৃত্বাধীন বোর্ড বিলুপ্ত ঘোষণা করে। বিসিবির আগের নির্বাচন নিয়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানানো হয়। একই দিনে সাবেক জাতীয় দলের অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন করা হয়। তাদের দায়িত্ব ছিল ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজন করা এবং বোর্ডের প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখা।
পরবর্তী সময়ে ৭ জুন অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচন। সেই নির্বাচনে তামিম ইকবাল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চার বছরের জন্য বিসিবির সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে আমিনুল ইসলামের দাবি, নির্বাচন আয়োজনের আগে তার অপসারণই ছিল আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে ওই নির্বাচনের বৈধতাও পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এই প্রশাসনিক বিরোধের পেছনে রয়েছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ। বিসিবির নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তদন্তের দাবি জোরালো হয়। তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন একটি পক্ষ দাবি করেছিল, ঢাকার ৭৬টি ক্লাবের মধ্যে ৫০টি ক্লাব নির্বাচনী অনিয়মের তদন্তের পক্ষে মত দিয়েছে। পরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই আমিনুল নেতৃত্বাধীন বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়।
আমিনুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৩০ মে বিসিবির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এর আগে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ফারুক আহমেদকে কাউন্সিলর পদ থেকে অপসারণ করলে তিনি সভাপতির দায়িত্বও হারান। ফারুক আহমেদ ২০২৪ সালের আগস্টে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী নাজমুল হাসানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন।
সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগে আমিনুল ইসলাম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে উন্নয়ন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দেশের ক্রিকেটে একটি স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল নির্বাচন শেষে আবার আইসিসিতে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেই নির্বাচনে অংশ নেন এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সিদ্ধান্তে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের জন্য আইসিসির অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অর্থ দিয়ে বোর্ডের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, নারী ক্রিকেট, কোচ ও আম্পায়ার উন্নয়ন কর্মসূচি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, গ্রাসরুট ক্রিকেট এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প পরিচালিত হয়। ফলে কোনো কারণে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন স্থগিত হলে তার প্রভাব দেশের ক্রিকেট ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে পড়তে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত আইসিসি এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা মন্তব্য দেয়নি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও তাদের পূর্ণাঙ্গ অবস্থান প্রকাশ করেনি। ফলে বিষয়টি এখন আইনি ব্যাখ্যা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। আইসিসি উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথি পর্যালোচনার পর কী অবস্থান নেয়, সেটিই আগামী দিনে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।