ভারত সফর নিশ্চিত করতে এবার সরকারি পর্যায়ে বিসিবির তৎপরতা

ভারতীয় ক্রিকেট দলের আসন্ন বাংলাদেশ সফর নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে এবার ক্রিকেট প্রশাসনের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়েও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। আগামী সেপ্টেম্বরে দুই দলের ছয় ম্যাচের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজনের বিষয়ে বিসিবি এখনো আশাবাদী। তবে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সম্মতি না পাওয়ায় সফরটি নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে বিসিবি।

ক্রিকেটবিষয়ক একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল এবং বোর্ডের নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান সাইয়েদ ইব্রাহিম পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশ সফর নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিসিবি সভাপতি বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আলোচনায় ঠিক কোন কোন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে, তা প্রকাশ করেননি। তবে বৈঠকের সময় ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি স্পষ্ট যে, নির্ধারিত সময়ে ভারতীয় দলকে বাংলাদেশে আনার ক্ষেত্রে বিসিবি এখন সরকারি পর্যায়ের সহযোগিতাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। বিশেষ করে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়ে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সূচি অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরে তিনটি ওয়ানডে এবং তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে। অর্থাৎ দুই দলের মধ্যে মোট ছয়টি সীমিত ওভারের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সফরটি হলে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর আলাদা গুরুত্ব থাকবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেট আয়োজনকে স্বাভাবিক ধারায় ফেরানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এই সিরিজ মাঠে গড়ানোর জন্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই অনুমোদন এখনো না আসায় বিসিবির আশাবাদ থাকলেও সফরটি চূড়ান্ত হয়েছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই। ফলে নির্ধারিত সময় যত এগিয়ে আসছে, ততই দুই দেশের ক্রিকেট প্রশাসন ও সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগের গুরুত্ব বাড়ছে।

এর আগে ২৯ জুলাই বিসিবি সভাপতি জানিয়েছিলেন, ভারত সিরিজ আয়োজনের বিষয়ে বোর্ড আশাবাদী। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে এমন ইঙ্গিতও ছিল যে, সফরটি চূড়ান্ত করার কিছু বিষয় বিসিবির সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে শুধু ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি বা দুই বোর্ডের যোগাযোগ যথেষ্ট নাও হতে পারে; প্রয়োজনে সরকারি পর্যায়ে সমন্বয়ও প্রয়োজন হতে পারে। এর ঠিক পরদিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হওয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় ক্রিকেট সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালে দুই দলের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে সিরিজটি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুই দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের মধ্যে তৈরি হওয়া বিভিন্ন জটিলতা এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতির কারণে বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। এর ফলে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সিরিজ আয়োজনের বিষয়টি কেবল ক্রীড়া পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের পরিবেশও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজন সাধারণত দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ভ্রমণব্যবস্থা, প্রশাসনিক অনুমোদন, খেলোয়াড় ও দলের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সফর বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক যখন নানা কারণে আলোচনায় থাকে, তখন একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সফরকে ঘিরে ক্রিকেট প্রশাসনের বাইরের যোগাযোগও গুরুত্ব পেতে পারে।

এই বাস্তবতায় বিসিবির সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বোর্ডের নতুন পরিচালনা পর্ষদ দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্ককে আবারও স্বাভাবিক ও কার্যকর ধারায় ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী—সাম্প্রতিক তৎপরতা থেকে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও কিছু ইতিবাচক বার্তার কথা সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত সরকার। পাশাপাশি ২৯ জুলাই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।

কূটনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এমন উদ্যোগ ক্রিকেট অঙ্গনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ যত বেশি স্থিতিশীল হবে, ক্রিকেটীয় সম্পর্কও তত সহজ পরিবেশে এগোনোর সুযোগ পাবে। বিশেষ করে একটি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজনের ক্ষেত্রে দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় থাকলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হতে পারে।

বিসিবির সামনে এখন মূল লক্ষ্য হলো সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত ছয় ম্যাচের সিরিজটি নিশ্চিত করা। এর জন্য একদিকে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সফর আয়োজনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে কূটনৈতিক যোগাযোগও জোরদার করা হচ্ছে। বিসিবির প্রত্যাশা, দুই দেশের সাম্প্রতিক ইতিবাচক যোগাযোগ এবং সরকারি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফর নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সফরটি বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু মাঠের ছয়টি ম্যাচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুই দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো, ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সিরিজের পথ সহজ করা এবং দীর্ঘদিনের অস্বস্তি কাটিয়ে ক্রিকেটীয় সম্পর্ককে আরও কার্যকর পর্যায়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এখন তাই সবার নজর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দিকে। বিসিবি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে এবং সফরটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতার পথও খুঁজছে। আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা, দুই দেশের ক্রিকেট প্রশাসনের যোগাযোগ এবং সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণ করবে সেপ্টেম্বরে বহুল প্রতীক্ষিত ভারত-বাংলাদেশ সাদা বলের সিরিজ শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়াবে কি না।

মন্তব্য করুন