শ্রীলঙ্কার নিরোশান ডিকভেলার আউট হওয়ার ঘটনা ক্রিকেটের সাধারণ স্কোরকার্ডে হয়তো একটি উইকেট হিসেবেই লেখা থাকবে। কিন্তু মাঠের কয়েক মুহূর্তের কথোপকথন, প্রতিপক্ষকে আক্রমণাত্মক শট খেলতে উসকে দেওয়া এবং তার পরের বলেই সেই শট খেলতে গিয়ে ক্যাচে পরিণত হওয়া—সব মিলিয়ে ঘটনাটি পেয়েছে আলাদা নাটকীয়তা।
শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসে ডিকভেলাকে আউট করেন ভারতের পেসার প্রসিধ কৃষ্ণা। উইকেটের পেছনে ক্যাচ নেন ঋষভ পন্ত। অথচ আউটের পর ভারতীয় খেলোয়াড়দের দেখা যায় যশস্বী জয়সোয়ালকে অভিনন্দন জানাতে। কারণ, কয়েক বল আগেই ডিকভেলাকে নির্দিষ্ট একটি আক্রমণাত্মক শট খেলতে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন জয়সোয়াল। শেষ পর্যন্ত সেই চ্যালেঞ্জের পরই ডিকভেলার ইনিংস থেমে যায়।
ঘটনার সূত্রপাত শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসের ৬০তম ওভারে। কৃষ্ণা তখন ধারাবাহিকভাবে শর্ট বল করছিলেন। স্কয়ার লেগ এলাকা থেকে ডিকভেলার কাছে এগিয়ে এসে জয়সোয়াল কথার ছলে তাঁকে হুক শট খেলতে প্ররোচিত করেন। প্রথম ইনিংসে ডিকভেলা ৮০ রান করেছিলেন। কিন্তু শর্ট বলের বিপক্ষে তিনি খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ আক্রমণাত্মক শট খেলেননি—জয়সোয়াল মূলত সেই বিষয়টিই সামনে আনেন।
জয়সোয়াল ডিকভেলাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, প্রথম ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে এমন কোনো বড় হুক শট দেখা যায়নি। এবার তিনি গ্যালারিতে বল পাঠানোর মতো একটি শট দেখতে চান। ডিকভেলা পাল্টা জানান, হুক শট তাঁর খুব একটা পছন্দের নয়। কথার ফাঁকে চলে আসে ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের প্রসঙ্গও। মজা করে ডিকভেলা বলেন, তাঁকে যদি ভারতের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতায় নেওয়া হয়, তাহলে হয়তো এমন শট খেলার সুযোগ আসতে পারে। জয়সোয়ালও একই রসিকতার সুরে তাঁকে আশ্বস্ত করেন।
এরপর কৃষ্ণার বলে ডিকভেলা কাট শট খেলে দুই রান নেন। কিন্তু জয়সোয়ালের চ্যালেঞ্জ তখনও শেষ হয়নি। তিনি আবারও ডিকভেলাকে গ্যালারির দিকে বল পাঠানোর কথা বলেন। এমনকি মজার ছলে জানান, ডিকভেলা যদি এমন একটি শট খেলতে পারেন, তাহলে তিনি শ্রীলঙ্কার সাবেক অধিনায়ক ও কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত কুমার সাঙ্গাকারার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলবেন।
সাঙ্গাকারার প্রসঙ্গ আসার পেছনেও ছিল পরিচিতির একটি যোগসূত্র। ডিকভেলা ও সাঙ্গাকারা দুজনেই ক্যান্ডির ট্রিনিটি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী। সাঙ্গাকারার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়েও ডিকভেলা শ্রীলঙ্কার টেস্ট দলে ছিলেন। ফলে জয়সোয়ালের ঠাট্টায় ক্রিকেটীয় চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি পুরোনো পরিচিতির প্রসঙ্গও যুক্ত হয়ে যায়।
তবে ডিকভেলার ব্যাট থেকে শেষ পর্যন্ত গ্যালারিতে কোনো বল যায়নি। বরং পরের বলেই ঘটে যায় সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা।
কৃষ্ণা আবারও শর্ট বল করেন। ডিকভেলা এবার কাট করার চেষ্টা করেন। বলটি শরীরের বেশ কাছে থাকায় শটটি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি পেছনে সরে গিয়ে ব্যাট চালান, কিন্তু বল ব্যাটের কানায় লেগে চলে যায় উইকেটের পেছনে। সেখানে প্রস্তুত ছিলেন পন্ত। তিনি সহজেই ক্যাচটি নেন।
১৭ বলে ১২ রান করে ডিকভেলার ইনিংস শেষ হয়। আর তাঁর বিদায়ের পর ভারতীয় খেলোয়াড়দের জয়সোয়ালকে অভিনন্দন জানানোর দৃশ্যটি মুহূর্তেই নজর কাড়ে। কয়েক বল আগে যে ব্যাটসম্যানকে গ্যালারিতে বল পাঠানোর চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই আক্রমণাত্মক মানসিকতারই প্রতিফলন দেখা গেল একটি উইকেটে।
তবে ঘটনাটিকে সরাসরি এমনভাবে দেখা ঠিক হবে না যে, জয়সোয়ালের কথার কারণেই ডিকভেলা আউট হয়েছেন। ক্রিকেটে একটি শটের ফলাফল নির্ধারণ করে অনেকগুলো বিষয়—বল কতটা দ্রুত ছিল, কতটা শর্ট ছিল, ব্যাটসম্যানের অবস্থান কী ছিল, বল শরীরের কতটা কাছে এসেছিল এবং শটের সময় ব্যাটের নিয়ন্ত্রণ কতটা ছিল। ডিকভেলার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় তাঁর শটের নিয়ন্ত্রণ হারানো।
তারপরও ঘটনাটি ক্রিকেটের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি সামনে এনেছে। মাঠে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথাবার্তা অনেক সময় নিছক রসিকতা হলেও তা ব্যাটসম্যানের মনোযোগে সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ কোনো ডেলিভারি বা শট নিয়ে বারবার কথা হলে একজন ব্যাটসম্যানের মাথায় সেই শটটি খেলার চিন্তা আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
ডিকভেলার ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটেছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে সময়ের ব্যবধান ঘটনাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রথমে হুক শট নিয়ে কথাবার্তা, এরপর গ্যালারিতে বল পাঠানোর চ্যালেঞ্জ, তারপর আরেকটি শর্ট বল এবং শেষ পর্যন্ত উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ—সবকিছু ঘটেছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে।
ক্রিকেটে এমন মুহূর্তই ম্যাচের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। একটি উইকেটের পেছনে কখনো থাকে কৌশল, কখনো থাকে চাপ, আবার কখনো থাকে কয়েকটি মজার বাক্য। ডিকভেলার বিদায়ও তাই শুধু স্কোরকার্ডের একটি সংখ্যা নয়; মাঠের রসিকতা কীভাবে ম্যাচের একটি স্মরণীয় দৃশ্য তৈরি করতে পারে, তারই একটি উদাহরণ হয়ে থাকল।