বাংলাদেশের বিপক্ষে আরও টেস্ট চান অ্যালেক্স ক্যারি

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমেই ইতিহাস গড়েছিল বাংলাদেশ। ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে বড় চমক দেখায় টাইগাররা। বিদেশের মাটিতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাসের নতুন মাত্রা যোগ করে। তবে দ্বিতীয় টেস্টে সেই সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি সফরকারীরা। ম্যাকাইয়ে মাত্র দুই দিনের মধ্যে ইনিংস ও ৫১ রানে হেরে দুই ম্যাচের সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ করে বাংলাদেশ।

সিরিজের ফলাফল সমতায় থামলেও বাংলাদেশের পারফরম্যান্স পুরোপুরি হতাশাজনক ছিল না। বরং প্রথম টেস্টের জয় এবং দ্বিতীয় ম্যাচের কিছু পর্যায়ের লড়াই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের কাছে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। বিশেষ করে পেস বোলিংয়ে বাংলাদেশের আক্রমণ অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের বেশ কয়েকবার অস্বস্তিতে ফেলেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিপক্ষে আরও বেশি টেস্ট খেলার ইচ্ছা জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার উইকেটরক্ষক-ব্যাটার অ্যালেক্স ক্যারি।

সোমবার (২৪ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে ক্যারি জানান, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিপক্ষে আরও টেস্ট সিরিজ হবে বলে তিনি আশা করছেন। তাঁর মতে, দুই দলের মধ্যে নিয়মিত টেস্ট খেলার সুযোগ থাকলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জমবে। সিরিজ শেষে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও তাঁর ভালো লেগেছে বলে জানান তিনি। মাঠের লড়াইয়ের বাইরে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে এমন যোগাযোগ টেস্ট ক্রিকেটের সংস্কৃতিরই একটি অংশ বলে মনে করেন ক্যারি।

শরীফুলের বোলিংয়ে মুগ্ধ ক্যারি

বাংলাদেশের পেসার শরীফুল ইসলাম বিশেষভাবে প্রশংসা পেয়েছেন ক্যারির কাছ থেকে। ম্যাকাই টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে ৭ উইকেট নেন শরীফুল। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে রাখতে তাঁর বোলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বলের গতি, সুইং এবং সঠিক জায়গায় আঘাত করার সামর্থ্য দিয়ে তিনি স্বাগতিক ব্যাটারদের পরীক্ষা নিয়েছেন।

শরীফুলের পারফরম্যান্স অবশ্য এই সিরিজেই প্রথম নজর কাড়েনি। এর আগে ঢাকায় ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচেও ৬ উইকেট নিয়ে দুর্দান্ত বোলিং করেছিলেন তিনি। ফলে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে পাওয়া সেই সাফল্যের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করার সুযোগ পান এই বাঁহাতি পেসার।

ক্যারি বলেন, ওয়ানডে সিরিজেই শরীফুলের সামর্থ্য তাঁরা দেখেছিলেন। ঢাকার ম্যাচে ৬ উইকেট নেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ায় এসেও তিনি একই রকম প্রভাব ফেলেছেন। ম্যাকাই টেস্টে তাঁর বোলিং ছিল বিশেষভাবে কার্যকর এবং পারফরম্যান্সের জন্য তিনি যথার্থ স্বীকৃতিও পেয়েছেন।

তবে শরীফুলকে আলাদা করে প্রশংসা করলেও বাংলাদেশের পুরো পেস বোলিং ইউনিটকেই কৃতিত্ব দিয়েছেন ক্যারি। তাঁর মতে, সিরিজজুড়ে বাংলাদেশের পেসাররা ভালো লাইন ও লেংথে বল করেছেন। নতুন বল হাতে তাঁরা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করতে পেরেছেন। ফলে দুই ম্যাচের সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল পেস আক্রমণ।

দুই দিনে টেস্ট শেষ হওয়া নিয়ে আপত্তি নেই

ম্যাকাই টেস্ট মাত্র দুই দিনে শেষ হওয়া নিয়েও ক্যারির মধ্যে কোনো আক্ষেপ নেই। তাঁর মতে, টেস্ট ক্রিকেটে ম্যাচের দৈর্ঘ্য সব সময় একই রকম হয় না। কখনো একটি টেস্ট পঞ্চম দিন পর্যন্ত গড়ায়, আবার কখনো ব্যাটিং-বোলিংয়ের আধিপত্যে দ্রুত ফল বেরিয়ে আসে।

ক্যারির কাছে মূল বিষয় হলো দলের পারফরম্যান্স এবং জয়। দুই দিন, তিন দিন কিংবা চার দিন—যত সময়ই লাগুক, মাঠে নিজেদের কাজ ঠিকভাবে করতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই অল্প সময়ে ম্যাচ শেষ হওয়াকে তিনি আলাদা কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছেন না।

প্রথম টেস্টের ভুল থেকে শিক্ষা অস্ট্রেলিয়ার

ডারউইনে বাংলাদেশের কাছে ৯ উইকেটে হারের পর অস্ট্রেলিয়ার ঘুরে দাঁড়ানো নিয়েও কথা বলেছেন ক্যারি। তাঁর মূল্যায়নে, প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়া প্রায় সব বিভাগেই বাংলাদেশের কাছে পিছিয়ে পড়েছিল। ব্যাটিং, বোলিং কিংবা ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো নিয়ন্ত্রণ—কোনোটিতেই তারা নিজেদের সেরা অবস্থায় ছিল না।

ম্যাকাইয়ে সেই চিত্র বদলে যায়। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা প্রথম ইনিংসে ২০০ রানের বেশি সংগ্রহ করে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেন। ক্যারির মতে, ওই ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার আরও বেশি রান করার সুযোগ ছিল। তবু স্কোরবোর্ডে পাওয়া লিড বাংলাদেশকে চাপে ফেলার জন্য যথেষ্ট হয়।

এরপর অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা দ্রুত বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আঘাত করেন। দুই ইনিংসেই স্বাগতিকদের বোলিং বাংলাদেশের ব্যাটারদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফলও আসে একতরফাভাবে।

বাংলাদেশের জন্য বড় শিক্ষা

দুই ম্যাচের এই সিরিজ বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সাফল্য ও শিক্ষার অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল। ডারউইনের জয় দেখিয়েছে, বিদেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষেও বাংলাদেশ জিততে পারে। আবার ম্যাকাইয়ের হার মনে করিয়ে দিয়েছে, টেস্টে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই ধারাবাহিকতা জরুরি।

বিশেষ করে পেসারদের পারফরম্যান্স বাংলাদেশের জন্য আশাব্যঞ্জক। শরীফুলের পাশাপাশি অন্য পেসাররাও অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে ভালো বল করেছেন। এমন অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে বিদেশের মাটিতে টেস্ট খেলার সময় কাজে লাগতে পারে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার জন্য সিরিজটি ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর পরীক্ষা। প্রথম টেস্টে বড় ব্যবধানে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে তারা যেভাবে দ্রুত পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, তাতে দলের মানসিক দৃঢ়তাও ফুটে ওঠে।

ক্যারির বাংলাদেশের বিপক্ষে আরও টেস্ট খেলার আগ্রহ তাই শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের প্রকাশ নয়, দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মান নিয়েও একটি ইতিবাচক বার্তা। নিয়মিত মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেলে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররাও বাংলাদেশের পেস আক্রমণ ও ভিন্ন কন্ডিশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন অভিজ্ঞতা পাবেন।

সব মিলিয়ে সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ হলেও দুই দলের ক্রিকেটেই এর প্রভাব থাকছে। বাংলাদেশের জন্য ডারউইনের ঐতিহাসিক জয় যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে, তেমনি ম্যাকাইয়ের পরাজয় সামনে এগোনোর জায়গাগুলোও স্পষ্ট করেছে। আর অ্যালেক্স ক্যারির মুখে বাংলাদেশের বিপক্ষে আরও টেস্ট খেলার আগ্রহ প্রকাশ পাওয়ায় ভবিষ্যতে দুই দলের টেস্ট লড়াই আরও নিয়মিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

মন্তব্য করুন