৩৮৯ রানের কঠিন লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের ব্যাটিং ভেঙে পড়েছে ইংল্যান্ডের পেস আক্রমণের সামনে। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৯৪ রানে অলআউট হয়ে ১৯৪ রানের বড় ব্যবধানে হেরেছে পাকিস্তান। এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে এক ম্যাচ হাতে রেখেই ২-০ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে ইংল্যান্ড।
চতুর্থ দিনের খেলা শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসের ৭ উইকেটে ১৭৭ রান নিয়ে। ক্রিজে থাকা ড্যান লরেন্স তখন ব্যক্তিগত অর্ধশতক পূর্ণ করে দলের লিড আরও বড় করার চেষ্টা করছিলেন। তবে ফিফটির পর আর বেশি দূর এগোতে পারেননি তিনি। ৭০ বলে ৫৪ রান করে লরেন্সের বিদায়ের পর ওলি রবিনসন করেন ১৫ বলে ৮ রান। শেষ দিকে জশ টাংয়ের ১৫ বলে ১২ রানের ছোট ইনিংসও ইংল্যান্ডের সংগ্রহে কিছুটা যোগ করে। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় ইনিংসে ২০৮ রানে থামে স্বাগতিকদের ইনিংস।
প্রথম ইনিংসে পাওয়া সুবিধার সঙ্গে এই রান যোগ হয়ে পাকিস্তানের সামনে জয়ের জন্য ৩৮৯ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায়। পাকিস্তানের বোলারদের মধ্যে মোহাম্মদ আব্বাস সবচেয়ে কার্যকর ছিলেন। তিনি পাঁচটি উইকেট তুলে নিয়ে ইংল্যান্ডের ব্যাটিংয়ে চাপ তৈরি করেন। খুররাম শাহজাদ ও মোহাম্মদ আলী নেন দুটি করে উইকেট। ইংল্যান্ডকে দ্রুত অলআউট করে পাকিস্তান অবশ্য রান তাড়ায় ভালো শুরুর সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি তারা।
রান তাড়ার শুরুটাই ছিল পাকিস্তানের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। উদ্বোধনী জুটি দলীয় ১০ রানও পার করতে পারেনি। মাত্র ৭ রানে আজান আওয়াইস ১৪ বলে ৭ রান করে ফিরে যান। এরপর আব্দুল্লাহ শফিক কোনো রান না করেই আউট হন। মাত্র ১৭ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান দ্রুত চাপে পড়ে যায়।
দলের অন্যতম বড় ভরসা অধিনায়ক বাবর আজমও ব্যর্থ হন। মাত্র ৮ বল মোকাবিলা করে ৬ রান করে তাঁকে ফিরে যেতে হয়। ফলে পাকিস্তানের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়। ইংল্যান্ডের পেসাররা নতুন বলের সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিয়মিত উইকেট তুলে নেওয়ায় পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ে স্থিরতা তৈরি হচ্ছিল না।
এই অবস্থায় শান মাসুদ ও সাউদ শাকিল কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দুজনই শুরুতে সতর্কভাবে খেললেও সুযোগ পেলে ইংল্যান্ডের বোলারদের ওপর আক্রমণ করেন। তাঁদের ব্যাটিংয়ে পাকিস্তানের স্কোরবোর্ডে সাময়িক স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু সেই জুটি বেশি সময় টেকেনি।
৭২ বলে ২৬ রান করে শান মাসুদ আউট হলে পাকিস্তান আবারও চাপে পড়ে। এরপর মোহাম্মদ রিজওয়ানও মাত্র ৯ বলে ১ রান করে ফিরে যান। একের পর এক উইকেট হারানোর ফলে ম্যাচে পাকিস্তানের জয়ের সম্ভাবনা দ্রুত ক্ষীণ হয়ে আসে। তখন দলের প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়ান সাউদ শাকিল।
শাকিল দায়িত্ব নিয়ে ব্যাট করতে থাকেন। ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির বোলিংয়ের বিপক্ষে তাঁর ফুটওয়ার্ক ছিল আত্মবিশ্বাসী এবং শট নির্বাচনে ছিল নিয়ন্ত্রণ। চাপের মধ্যেও তিনি অর্ধশতক পূর্ণ করেন। তাঁর ব্যাটিং দেখে পাকিস্তানের সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। ৩৮৯ রানের লক্ষ্য তখনও অনেক দূরে, তবে অন্তত দীর্ঘ সময় ব্যাট করে ম্যাচে প্রতিরোধ গড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
অন্য প্রান্তে আলি উসমান তাঁকে সঙ্গ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ৪৪ বলে ১৬ রান করে তাঁর বিদায়ের পর শাকিল আবারও একা হয়ে পড়েন। তবু আক্রমণাত্মক না হয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করে তিনি দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান। একপর্যায়ে সেঞ্চুরির খুব কাছেও পৌঁছে যান এই বাঁহাতি ব্যাটার।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র তিন রানের আক্ষেপ নিয়ে ফিরতে হয় তাঁকে। জশ টাংয়ের বলে আউট হওয়ার আগে ১২২ বলে ৯৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন শাকিল। পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসে তিনিই ছিলেন সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। মাত্র তিন রানের জন্য সেঞ্চুরি না পাওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকলেও, দলের চরম বিপর্যয়ের মধ্যে তাঁর ইনিংসটি ছিল লড়াইয়ের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
শাকিলের বিদায়ের পর পাকিস্তানের লেজের ব্যাটাররা আর ইংল্যান্ডের বোলিং প্রতিরোধ করতে পারেননি। খুররাম শাহজাদ ১৩ বলে ৯, মোহাম্মদ আলী ৫ বলে ৮ এবং মোহাম্মদ আব্বাস ১৬ বলে ১৩ রান করেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৪ রানেই শেষ হয় পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংস।
ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণে সবচেয়ে সফল ছিলেন ওলি রবিনসন। তিনি চারটি উইকেট নেন। জশ টাং তিনটি এবং জফরা আর্চার দুটি উইকেট শিকার করেন। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে টাংয়ের উইকেট নেওয়ার দক্ষতা পাকিস্তানের শেষ প্রতিরোধ ভেঙে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। ইংল্যান্ডের পেসারদের ধারাবাহিক লাইন-লেন্থ এবং চাপ ধরে রাখার ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়।
ম্যাচটির একটি পরিসংখ্যানও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ—ইংল্যান্ড জয় পেয়েছে ১৯৪ রানে, আর পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসও শেষ হয়েছে ১৯৪ রানে। তবে সংখ্যাটির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দুই দলের ব্যাটিংয়ের পার্থক্য। ইংল্যান্ড প্রয়োজনের সময় রান সংগ্রহ করেছে এবং পাকিস্তানকে বড় লক্ষ্য দিয়েছে; বিপরীতে পাকিস্তান সেই লক্ষ্য মোকাবিলায় শুরু থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়েছে।
এই জয়ের মাধ্যমে তিন ম্যাচের সিরিজে ইংল্যান্ড ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল এবং শেষ ম্যাচের ফলাফল সিরিজের চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণে আর কোনো প্রভাব ফেলবে না। তবে পাকিস্তানের জন্য শেষ ম্যাচটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ না থাকলেও অন্তত একটি জয় নিয়ে লড়াই শেষ করার লক্ষ্য থাকবে তাদের। অন্যদিকে ইংল্যান্ড চাইবে নিজেদের আধিপত্য আরও বাড়িয়ে সিরিজ ৩-০ ব্যবধানে শেষ করতে।
সিরিজের ফল এরই মধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেলেও শেষ ম্যাচে দুই দলের জন্যই আলাদা প্রেরণা থাকবে। পাকিস্তান চাইবে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা কাটিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে, আর ইংল্যান্ডের লক্ষ্য থাকবে ধারাবাহিকতা ধরে রেখে সিরিজে পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।