দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য ১৬ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে অস্ট্রেলিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাট হাতে দীর্ঘ রানখরায় থাকা মার্নাস লাবুশেনকে নিয়েই দল সাজিয়েছেন নির্বাচকেরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও তার ওপর আস্থা হারায়নি অস্ট্রেলিয়া।
বাংলাদেশের বিপক্ষে তিন ইনিংসে লাবুশেন করেছিলেন মাত্র ১, ৩১ ও ৪ রান। ফলে সিরিজের পরই তার ফর্ম নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সর্বশেষ টেস্ট সেঞ্চুরি পাওয়ার পর ৪৩ ইনিংসে তার ব্যাটিং গড় নেমে এসেছে ২৪.৬৯-এ। একসময় অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ব্যাটিংয়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত এই ব্যাটারের জন্য পরিসংখ্যানটি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।
লাবুশেনের সাম্প্রতিক সংকট শুধু টেস্ট ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ নয়। জিম্বাবুয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ানডে সফরের দল থেকেও বাদ পড়েছিলেন তিনি। ফলে টেস্ট দলে আবারও সুযোগ পাওয়াটা তার জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এবার নিজের জন্মভূমির মাটিতে পুরোনো ছন্দ ফিরে পাওয়ার চ্যালেঞ্জ সামনে লাবুশেনের।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাচক জর্জ বেইলি তার বর্তমান ফর্ম নিয়ে বাস্তবতাকে আড়াল করেননি। তিনি বলেছেন, লাবুশেনের কাছ থেকে দল আরও বেশি রান চায়। একই সঙ্গে নির্বাচকদের বিশ্বাস, প্রয়োজনের সময়ে অবদান রাখার মতো সামর্থ্য এখনো তার রয়েছে। সেই আস্থার কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের স্কোয়াডে রাখা হয়েছে তাকে।
দলে ফিরেছেন তরুণ অলরাউন্ডার কুপার কনোলি। বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার দলে না থাকলেও ওয়ানডেতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। গত জুনে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করে আলোচনায় আসেন কনোলি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এখনো বড় ইনিংসের ধারাবাহিকতা তৈরি করতে না পারলেও তার সম্ভাবনা এবং শেখার আগ্রহ বিবেচনায় নিয়ে তাকে আবার টেস্ট স্কোয়াডে রাখা হয়েছে।
কনোলির উন্নতির ব্যাপারে আশাবাদী বেইলিও। জাতীয় দলের সঙ্গে প্রতিবার কাজ করার সুযোগ থেকে এই তরুণ ক্রিকেটার নতুন কিছু শিখছেন এবং নিজের খেলা আরও পরিণত করার ব্যাপারে তার আগ্রহ রয়েছে—এমনটাই মনে করেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাচক। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশন তাই কনোলির জন্য শুধু দলের অংশ হওয়ার সুযোগ নয়, নিজেকে আরও ভালোভাবে পরখ করার মঞ্চও হতে পারে।
পেস বোলিং বিভাগেও রয়েছে স্বস্তির খবর। চোট কাটিয়ে দলে ফিরেছেন মাইকেল নেসার। প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজেলউড ও স্কট বোল্যান্ডের সঙ্গে নেসারের অন্তর্ভুক্তি অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণে বাড়তি বিকল্প তৈরি করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে পেসাররা সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী একাদশ সাজাতে অস্ট্রেলিয়ার হাতে এখন একাধিক বিকল্প থাকবে।
স্পিন বিভাগে নাথান লায়নের সঙ্গে জায়গা পেয়েছেন বাঁহাতি স্পিনার ম্যাথু কুহনেমান। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে দুই স্পিনারকে একাদশে রাখার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। তারপরও কুহনেমানকে স্কোয়াডে রাখা হয়েছে প্রস্তুতি ও কৌশলগত বিকল্প বিবেচনায়। দক্ষিণ আফ্রিকার বাঁহাতি স্পিনার কেশব মহারাজের বিপক্ষে ব্যাটারদের প্রস্তুতিতেও কুহনেমানের বোলিং কার্যকর হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার দলটিতে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে। ব্যাটিংয়ে স্টিভেন স্মিথ, ট্রাভিস হেড ও লাবুশেনের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের পাশাপাশি ক্যামেরন গ্রিন, বিউ ওয়েবস্টার, ম্যাট রেনশ ও কুপার কনোলির মতো খেলোয়াড় রয়েছেন। উইকেটকিপিংয়ের জন্য রাখা হয়েছে অ্যালেক্স ক্যারি ও জশ ইংলিসকে। বোলিংয়ে নেতৃত্ব দেবেন প্যাট কামিন্স, আর তার সঙ্গে থাকবেন অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ পেস ও স্পিন আক্রমণ।
সিরিজটির গুরুত্ব দ্বিপক্ষীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরেও। তিন ম্যাচের এই সিরিজ ২০২৫-২৭ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রের অংশ। ফলে প্রতিটি ম্যাচের ফল পয়েন্ট তালিকায় দুই দলের অবস্থানে প্রভাব ফেলবে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের নতুন চক্রে ভালো শুরু পাওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা—দুই দলের কাছেই সিরিজটি গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী অক্টোবরে ডারবান, গেবেখা ও কেপটাউনে তিনটি টেস্টে মুখোমুখি হবে দুই দল। সাম্প্রতিক ইতিহাসও এই লড়াইকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে। সর্বশেষ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে লর্ডসে মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।
নতুন চক্রে অবশ্য সেই লড়াইয়ের হিসাব নতুন করে শুরু হবে। অস্ট্রেলিয়ার সামনে থাকবে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সংগ্রহের লক্ষ্য, আর দক্ষিণ আফ্রিকা চাইবে ঘরের মাঠে নিজেদের শক্তি কাজে লাগাতে। এই সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবেন লাবুশেন। দীর্ঘ রানখরা কাটিয়ে তিনি যদি বড় ইনিংসে ফিরতে পারেন, তাহলে তার ব্যক্তিগত অবস্থান যেমন শক্ত হবে, তেমনি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপও পাবে বাড়তি স্থিরতা।
অস্ট্রেলিয়ার ১৬ সদস্যের স্কোয়াড
প্যাট কামিন্স (অধিনায়ক), জশ ইংলিস (উইকেটকিপার), অ্যালেক্স ক্যারি (উইকেটকিপার), মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজেলউড, স্কট বোল্যান্ড, মাইকেল নেসার, বিউ ওয়েবস্টার, ম্যাট রেনশ, মার্নাস লাবুশেন, ট্রাভিস হেড, ক্যামেরন গ্রিন, স্টিভেন স্মিথ, নাথান লায়ন, ম্যাথু কুহনেমান ও কুপার কনোলি।