পাকিস্তান ক্রিকেটে সাম্প্রতিক অস্থিরতা যেন কিছুতেই কাটছে না। কোচ ও অধিনায়ক পরিবর্তন, দল পুনর্গঠন এবং একের পর এক হতাশাজনক পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক এবি ডি ভিলিয়ার্স মনে করেন, পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের দায় শুধু পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) ওপর চাপালে সমস্যার পুরো চিত্র সামনে আসবে না। তার দৃষ্টিতে, মাঠের ক্রিকেটে বিশেষ করে ব্যাটিংয়ে সাহস, দৃঢ়তা ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াই করে যাওয়ার মানসিকতার ঘাটতিও দলের দুরবস্থার বড় কারণ।
ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তানের প্রথম দুই টেস্টের পারফরম্যান্সই ডি ভিলিয়ার্সের সমালোচনার প্রধান ভিত্তি। হেডিংলি ও লর্ডসে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে বড় ব্যবধানে হারে পাকিস্তান। চার ইনিংসের কোনো একটিতেও দলটি ২০০ রান অতিক্রম করতে পারেনি। প্রথম টেস্ট মাত্র তিন দিনেই শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় টেস্ট চতুর্থ দিন পর্যন্ত গড়ালেও বৃষ্টির কারণে ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়েছিল। ফলে পাকিস্তানের ব্যাটিং ইউনিট কোনো ইনিংসেই দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
টেস্ট ক্রিকেটে এমন ধারাবাহিক ব্যাটিং ব্যর্থতা শুধু স্কোরবোর্ডের দুর্বলতা নয়, বরং দলের মানসিক অবস্থারও প্রতিফলন—ডি ভিলিয়ার্সের বিশ্লেষণে বিষয়টি সেভাবেই উঠে এসেছে। তার মতে, প্রতিপক্ষ যখন চাপ তৈরি করে, তখন সেই চাপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ব্যাটারদের আরও বেশি পরিশ্রম, ধৈর্য এবং লড়াকু মানসিকতা দেখানো প্রয়োজন।
পরপর দুই টেস্টে ব্যর্থতার পর পাকিস্তান দলেও দ্রুত পরিবর্তন আনা হয়। সাতজন ক্রিকেটারকে দেশে ফেরত পাঠানো হয় এবং কয়েকজন তরুণ খেলোয়াড়কে দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কোচিং কাঠামোতেও পরিবর্তন আসে। টেস্ট দলের দায়িত্বে থাকা সরফরাজ আহমেদের জায়গায় সাদা বলের কোচ মাইক হেসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ সংকট মোকাবিলায় পাকিস্তান শুধু একাদশে পরিবর্তন আনেনি, দল পরিচালনার কাঠামো নিয়েও নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।
তবে ডি ভিলিয়ার্সের মতে, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া দরকার। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বিশেষ করে ব্যাটারদের মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার পর্যবেক্ষণ, দলের বেশ কয়েকজন ব্যাটারের মধ্যে কঠিন পরিস্থিতিতে বাড়তি পরিশ্রম করার তাগিদ এবং প্রতিপক্ষের চাপের বিপরীতে পাল্টা লড়াই করার দৃঢ়তা যথেষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
ডি ভিলিয়ার্সের কাছে টেস্ট ক্রিকেট কেবল টেকনিক ও শট খেলার দক্ষতার পরীক্ষা নয়। এটি একজন ক্রিকেটারের চরিত্রেরও পরীক্ষা। কখনো পরিস্থিতি এমন হতে পারে, যেখানে স্বাভাবিক ব্যাটিং করা সম্ভব নয়। রান আসতে পারে খুব ধীরে। দর্শকদের কাছে সেই ব্যাটিং হয়তো আকর্ষণীয়ও মনে হবে না। কিন্তু সেখানেই একজন ব্যাটারের মানসিক শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। উইকেট আঁকড়ে থাকা, শরীর ও মনকে চাপের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা এবং সুযোগের অপেক্ষায় থাকা—টেস্ট ক্রিকেটে এসব গুণের মূল্য অনেক।
নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতাও এই প্রসঙ্গে সামনে এনেছেন সাবেক এই প্রোটিয়া তারকা। তার বক্তব্যের সারকথা হলো, ব্যক্তিগত রেকর্ড বা পরিসংখ্যানের চেয়ে মাঠে নিজের চরিত্র প্রকাশ করাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। কত রান করলেন, কতটা সুন্দরভাবে করলেন—এসবের পাশাপাশি কঠিন সময়ে কীভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন, সেটিও একজন ক্রিকেটারের মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই জায়গাতেই পাকিস্তানের ঘাটতি দেখছেন ডি ভিলিয়ার্স। তার মতে, ম্যাচের কঠিন মুহূর্তে হঠাৎ দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ব্যক্তিগত নেতৃত্ব এখন পাকিস্তান দলে খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। প্রতিপক্ষ যখন আধিপত্য বিস্তার করছে, তখন একজন বা দুজন ব্যাটারের কাছ থেকে এমন লড়াই প্রত্যাশিত, যা বাকিদেরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে সেই দৃশ্য খুব কমই দেখা গেছে।
এ কারণে দলের চার-পাঁচজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডি ভিলিয়ার্স। তার মতে, নেতৃত্বের সব দায়িত্ব শুধু অধিনায়কের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। সিনিয়র ক্রিকেটারদের নিজেদের মধ্যেও দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে। তারা শুধু নিজেদের পারফরম্যান্সের জন্য খেলবেন না; তরুণ সতীর্থদের জন্য মাঠে উদাহরণও তৈরি করবেন।
এই নেতৃত্বের প্রয়োজন বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে আরও বেশি। কারণ দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটে একটি খারাপ সেশন পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে। আবার একটি বড় জুটি, কয়েক ঘণ্টার প্রতিরোধ কিংবা চাপের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস ম্যাচের চিত্রও পাল্টে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের উপস্থিতি তরুণদের মানসিকভাবে স্থির রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে পাকিস্তানের সমস্যাকে শুধু ক্রিকেটারদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না ডি ভিলিয়ার্স। পিসিবির দীর্ঘদিনের ‘চপিং অ্যান্ড চেঞ্জিং’ সংস্কৃতিরও সমালোচনা করেছেন তিনি। তার মতে, অধিনায়ক, কোচ ও নেতৃত্ব কাঠামোয় ঘন ঘন পরিবর্তন হলে একটি দলের মধ্যে স্থিরতা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। খেলোয়াড়েরা নিজেদের ভূমিকা নিয়েও অনিশ্চয়তায় ভুগতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগও তখন সীমিত হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তান ক্রিকেটে এমন পরিবর্তনের ঘটনা একাধিকবার দেখা গেছে। কোচিং স্টাফ ও নেতৃত্ব কাঠামোতে ধারাবাহিক পরিবর্তনের কারণে দলের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেসন গিলেস্পি ও গ্যারি কারস্টেনের মতো কোচও বিভিন্ন টানাপোড়েনের পর দায়িত্ব ছেড়েছেন। ফলে প্রতিবার নতুন পরিকল্পনা নিয়ে শুরু করার প্রয়োজন হয়েছে, কিন্তু একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাবর আজমকে ঘিরে ডি ভিলিয়ার্সের প্রত্যাশাও কম নয়। পাকিস্তানের তারকা ব্যাটারের প্রত্যাবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তিনি। তার আশা, বাবর এবার দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন, ফিট থাকবেন এবং ধীরে ধীরে সেই পরিচিত ব্যাটিং ছন্দে ফিরবেন, যার জন্য তিনি বিশ্ব ক্রিকেটে পরিচিত। তবে বাবরের ওপরই সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বিপক্ষে ডি ভিলিয়ার্স। তার মতে, দলের অন্য সিনিয়র ক্রিকেটারদেরও নেতৃত্বের ভার নিতে হবে।
পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল খেলোয়াড় পরিবর্তন বা কোচ বদলের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। দল পরিচালনায় স্থিরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি মাঠে ক্রিকেটারদের দায়িত্ববোধও বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ব্যাটিং বিপর্যয়ের সময় কতক্ষণ প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, প্রতিপক্ষের বোলারদের কতটা সময় ধরে চ্যালেঞ্জ জানানো যায় এবং চাপের মধ্যেও কীভাবে ম্যাচে টিকে থাকা যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
ডি ভিলিয়ার্সের বক্তব্যের মূল বার্তাটি সেখানেই। পাকিস্তান ক্রিকেটে পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই পরিবর্তন যেন শুধু বোর্ডের সিদ্ধান্ত, কোচ বদল কিংবা নতুন খেলোয়াড় আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ক্রিকেটারদের নিজেদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। সিনিয়রদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে, তরুণদের লড়াইয়ের মানসিকতা শেখাতে হবে এবং ব্যাটিংয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার সামর্থ্য বাড়াতে হবে।
কারণ টেস্ট ক্রিকেটে সব দিন ব্যাট হাতে নান্দনিক ক্রিকেট খেলা যায় না। কখনো পরিস্থিতি দাবি করে শুধু টিকে থাকতে। কখনো দলের জন্য ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে উইকেট আগলে রাখতে হয়। আবার কখনো একটি কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষকে বোঝাতে হয়—এই দল এত সহজে ভেঙে পড়বে না। ডি ভিলিয়ার্সের চোখে, পাকিস্তানের ঘুরে দাঁড়ানোর পথের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটিও এখন সেই মানসিক দৃঢ়তা।