শেষ উইকেটের রোমাঞ্চে জিম্বাবুয়েকে ধবলধোলাই অস্ট্রেলিয়ার

হারারে স্পোর্টস ক্লাবে শেষ উইকেট পর্যন্ত গড়ানো রোমাঞ্চকর ম্যাচে জিম্বাবুয়েকে ১ উইকেটে হারিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করেছে অস্ট্রেলিয়া। ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সিরিজের শেষ ম্যাচে ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৪৯.৫ ওভারে ৯ উইকেটে ২৭২ রান করে জয় তুলে নেয় সফরকারীরা।

অস্ট্রেলিয়ার এই জয়ের মূল ভিত গড়ে দেন জশ ইংলিস। চাপে পড়া দলের হয়ে ১০২ বলে ১০৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন এই উইকেটকিপার-ব্যাটার। তবে তাঁর বিদায়ের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আবারও জিম্বাবুয়ের হাতে চলে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত নাথান এলিস ও স্পেন্সার জনসনের শেষ উইকেটের অবিচ্ছিন্ন জুটি অস্ট্রেলিয়াকে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করে।

টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় জিম্বাবুয়ে। শুরুটা অবশ্য স্বাগতিকদের পক্ষে যায়নি। দলীয় ৩৪ রানে বেন কারান ৭ রান করে ফেরেন। ৪৮ রানের মধ্যে দ্বিতীয় উইকেটও হারায় জিম্বাবুয়ে; ব্রায়ান বেনেটের ব্যাট থেকে আসে ৩০ রান।

এরপর ইনোসেন্ট কাইয়া ও ক্রেইগ আরভিন মিলে ইনিংস সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কাইয়া ৬৬ বলে সাতটি চারের সাহায্যে ৫৫ রান করেন। তবে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটের কারণে দলীয় ১৪৮ রানের সময় তাঁকে অবসর নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়। আরভিনও দায়িত্বশীল ব্যাটিং করেন। ৭৯ বলে পাঁচটি চারের সাহায্যে ৫৯ রান করেন তিনি।

ইনিংসের শেষ দিকে জিম্বাবুয়ের রান বাড়ানোর দায়িত্ব নেন অধিনায়ক সিকান্দার রাজা। ৭২ বলে ৮১ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল সাতটি চার ও একটি ছক্কা। শেষ দিকে ব্র্যাড ইভান্সের ১১ এবং আর্নেস্ট মাসুকুরের ৩ রানের সহায়তায় ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৭১ রান সংগ্রহ করে জিম্বাবুয়ে।

অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন নাথান এলিস। ১০ ওভারে ৫০ রান দিয়ে তিনটি উইকেট নেন তিনি। স্পেন্সার জনসন ৫০ রান দিয়ে এবং অ্যাডাম জাম্পা ৫৩ রান দিয়ে দুটি করে উইকেট শিকার করেন।

শুরুতেই তিন উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া

২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। মাত্র ২০ রানের মধ্যে ট্রাভিস হেড ও অধিনায়ক মিচেল মার্শকে হারায় তারা। হেড ৬ এবং মার্শ মাত্র ৮ রান করে ফেরেন। এরপর ২৫ রানে তৃতীয় উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। গ্রায়েম ক্রেমারের বলে বোল্ড হওয়ার আগে কুপার কনোলি করেন ৩৯ বলে ২১ রান।

সেখান থেকে দলের হাল ধরেন জশ ইংলিস ও অ্যালেক্স ক্যারি। দুজনের ব্যাটে অস্ট্রেলিয়ার রান তাড়া আবার ছন্দে ফেরে। চতুর্থ উইকেটে তাঁরা যোগ করেন ৫০ রান। ইংলিস দ্রুত অর্ধশতক পূর্ণ করেন—৪৭ বলেই পৌঁছে যান ফিফটির মাইলফলকে।

ক্যারি ৩০ বলে ৩৪ রান করে আউট হলেও ইংলিস থামেননি। এক প্রান্ত আগলে রেখে দলকে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নেন তিনি। ১০২ বলের ইনিংসে ১১টি চার মেরে ১০৩ রান করেন। ওয়ানডেতে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় শতক।

তবে ক্যারির বিদায়ের পর আবারও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে ধস নামে। ম্যাট রেনশ ৪, অলিভার পিক ১৯ এবং জাভিয়ের বার্টলেট ৩ রান করে ফিরে যান। ২০৬ রানেই সাত উইকেট হারিয়ে বসে অস্ট্রেলিয়া।

ইংলিসের বিদায়ে বদলে যায় সমীকরণ

ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি আসে ৪১.১ ওভারে। দলীয় ২২৭ রানে সিকান্দার রাজার বলে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরেন ইংলিস। তাঁর ১০৩ রানের ইনিংস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের পথ কঠিন হয়ে যায়। তখনও প্রয়োজন ছিল ৪৫ রান, হাতে মাত্র দুই উইকেট।

নাথান এলিস ও অ্যাডাম জাম্পা মিলে কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন। তাঁদের ব্যাটে অস্ট্রেলিয়া ২৪৫ রান পর্যন্ত পৌঁছায়। এরপর জাম্পা আউট হলে হাতে থাকে আর মাত্র একটি উইকেট। জয়ের জন্য প্রয়োজন তখন ২৭ রান।

ব্যাটিংয়ে এলিসের সঙ্গী হন স্পেন্সার জনসন। শেষ জুটির সামনে ছিল বিশাল চাপ। একদিকে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রান, অন্যদিকে জিম্বাবুয়ের সামনে ছিল শেষ উইকেটটি তুলে নিয়ে ম্যাচ জেতার সুযোগ।

কিন্তু এলিস হাল ছাড়েননি। নিজের বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই অলরাউন্ড পারফরমার শেষ দিকে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন। জনসনও তাঁকে সঙ্গ দেন। ধীরে ধীরে ব্যবধান কমতে থাকে।

শেষ ওভারে অস্ট্রেলিয়ার প্রয়োজন ছিল ৯ রান। ওভারের প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচের সমীকরণ অনেকটাই বদলে দেন এলিস। এরপর প্রয়োজনীয় রান তুলে এক বল বাকি থাকতেই অস্ট্রেলিয়ার জয় নিশ্চিত হয়।

এলিস ৪৪ বলে ৩৬ রানে অপরাজিত থাকেন। তাঁর ইনিংসে ছিল দুটি চার ও একটি ছক্কা। অন্য প্রান্তে স্পেন্সার জনসন ১৩ বলে ৭ রানে অপরাজিত ছিলেন। শেষ উইকেটে তাঁদের জুটিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়।

জিম্বাবুয়ের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন ব্র্যাড ইভান্স। ১০ ওভারে ৪৭ রান দিয়ে চার উইকেট নেন তিনি। গ্রায়েম ক্রেমার ও সিকান্দার রাজা দুটি করে উইকেট শিকার করেন।

তিন ম্যাচের সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচেও জয় পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। তবে সিরিজের শেষ ম্যাচটি ছিল সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। ২৭১ রান করার পর জিম্বাবুয়ে একসময় অস্ট্রেলিয়াকে ২২৭ রানে ৮ উইকেটে আটকে দিয়েছিল। সেখান থেকে শেষ উইকেটে ২৭ রান তুলে জয় ছিনিয়ে নেয় সফরকারীরা।

ফলে সিরিজের ফল দাঁড়ায় ৩-০। জিম্বাবুয়ের ব্যাটিংয়ে সিকান্দার রাজার ৮১ রানের অপরাজিত ইনিংস যেমন দলকে লড়াইয়ের পুঁজি এনে দিয়েছিল, তেমনি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ইংলিসের শতক রান তাড়াকে এগিয়ে দেয়। শেষ মুহূর্তে এলিস-জনসনের জুটি সেই লড়াইয়ের নাটকীয় সমাপ্তি ঘটায়।

হারারের এই ম্যাচে তাই ফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় থাকবে শেষ উইকেটের লড়াই। একসময় অস্ট্রেলিয়ার জয় কঠিন মনে হলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র এক বল হাতে রেখে লক্ষ্য ছুঁয়ে সিরিজে পূর্ণাঙ্গ সাফল্য নিশ্চিত করে সফরকারীরা।

মন্তব্য করুন