আফগানিস্তান সিরিজে কন্ডিশন সামলানোর প্রস্তুতিতে বাংলাদেশ

সংযুক্ত আরব আমিরাতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ সামনে রেখে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিক স্কিল ক্যাম্প শুরু করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। দেশ ছাড়ার আগে এই ক্যাম্পে ব্যাটিং ও বোলিংয়ের পাশাপাশি ভিন্ন ধরনের উইকেট ও কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নেটে দীর্ঘ সময় ধরে অনুশীলন করছেন ক্রিকেটাররা। ব্যবহার করা হচ্ছে স্পিন বোলিং মেশিন, আবার পেসারদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ স্ল্যাব।

দলের প্রস্তুতির ধরন, চোটের কারণে নাহিদ রানার অনুপস্থিতি, জাকের আলী অনিকের দলে ফেরা এবং সাদমান ইসলামের বর্তমান ফর্ম নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল।

শুধু স্পিন সামলানো নয়, প্রস্তুতি সব পরিস্থিতির জন্য

আফগানিস্তানের দলে শক্তিশালী স্পিন আক্রমণ রয়েছে। তাই মিরপুরের অনুশীলনে স্পিন বোলিং মেশিনের ব্যবহার দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, আফগানিস্তানের কথা মাথায় রেখেই কি এই প্রস্তুতি?

আশরাফুলের উত্তর, বিষয়টি শুধু আফগানিস্তানকে ঘিরে নয়। প্রধান কোচ ফিল সিমন্স নিয়মিতই বিশেষ ধরনের অনুশীলন করিয়ে থাকেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের আগেও বোলিং মেশিন এবং পেসারদের জন্য বিশেষ স্ল্যাব ব্যবহার করা হয়েছিল।

দুবাই যাওয়ার আগে বাংলাদেশ মোট ছয়টি স্কিল ট্রেনিং সেশন পাবে। টেস্ট স্কোয়াডের খেলোয়াড়রা এরই মধ্যে নিজেদের ফিটনেস ও ব্যক্তিগত প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এবার শুরু হয়েছে দলীয়ভাবে স্কিল উন্নয়নের কাজ।

আফগানিস্তান স্পিন-সহায়ক উইকেট তৈরি করতে পারে—এমন সম্ভাবনাও মাথায় রাখা হচ্ছে। তবে শুধু স্পিনবান্ধব পিচের কথা ভেবে প্রস্তুতি নিচ্ছে না বাংলাদেশ। ভালো ব্যাটিং উইকেট, মন্থর পিচ কিংবা বোলারদের সহায়তা করে এমন কন্ডিশন—সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য ক্রিকেটারদের প্রস্তুত করার চেষ্টা চলছে।

দীর্ঘ সময় ব্যাটিংয়ে মনোযোগ

মিরপুরে সর্বশেষ অনুশীলন সেশনে মুশফিকুর রহীমসহ দলের ব্যাটারদের নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন আশরাফুল। লাঞ্চের আগে প্রায় দুই ঘণ্টা এবং বিরতির পর আরও দেড় ঘণ্টা অনুশীলন করেন ক্রিকেটাররা।

ব্যাটারদের জন্য মূল লক্ষ্য ছিল উইকেটে দীর্ঘ সময় কাটানোর অভ্যাস তৈরি করা। টেস্ট ক্রিকেটে একটি ভালো শুরুকে বড় ইনিংসে রূপ দিতে হলে ধৈর্য, মনোযোগ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করার সক্ষমতা প্রয়োজন। সেই মানসিক প্রস্তুতির ওপরই এখন জোর দেওয়া হচ্ছে।

বোলারদের ক্ষেত্রেও একইভাবে দীর্ঘ স্পেল করার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। শুধু গতি বা উইকেট নেওয়ার চেষ্টা নয়, দীর্ঘ সময় ধরে লাইন-লেন্থ ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়টিও অনুশীলনের অংশ।

আশরাফুল জানিয়েছেন, পরবর্তী সেশনেও একই পরিকল্পনা থাকবে। টেস্ট ক্রিকেটের সঙ্গে মানানসই দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটিং ও বোলিংয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাই আপাতত দলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

একমাত্র টেস্টে থাকছেন না নাহিদ রানা

চোটের কারণে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে খেলতে পারবেন না পেসার নাহিদ রানা। বর্তমানে তিনি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।

ওয়ানডে সিরিজে রানাকে পাওয়া যাবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। তার ফিটনেস পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রধান কোচ, অধিনায়ক ও নির্বাচকেরা আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন আশরাফুল।

রানার অনুপস্থিতি দলের পেস আক্রমণে প্রভাব ফেললেও অন্য বোলারদের পারফরম্যান্স নিয়ে আশাবাদী বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং কোচ। অস্ট্রেলিয়া সফরের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, রানা ছাড়াই বাংলাদেশ একটি টেস্টে জয় পেয়েছিল। দ্বিতীয় টেস্টেও পেসাররা ভালো লড়াই করেছিলেন।

দলে যারা সুযোগ পাচ্ছেন, তারা নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর চেষ্টা করছেন বলেও উল্লেখ করেন আশরাফুল। ফলে একজন গুরুত্বপূর্ণ পেসারকে না পেলেও দলের হাতে বিকল্প তৈরি হচ্ছে।

জাকের আলীর ব্যাটিংয়ে ফিরেছে আত্মবিশ্বাস

প্রায় এক বছর পর জাতীয় দলে ফিরেছেন জাকের আলী অনিক। অনুশীলনে তার ব্যাটিং দেখে সন্তুষ্ট আশরাফুল।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম টেস্টের আগে জাকেরের ব্যাটিং অনুশীলনও ভালো ছিল বলে জানান তিনি। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে খেলেছেন জাকের এবং রানও করেছেন।

সেসব পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় তার ব্যাটিংয়ে আগের আত্মবিশ্বাসী ছন্দ ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন আশরাফুল। জাতীয় দলের মূল একাদশে সুযোগ পেলে জাকের নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।

দীর্ঘ বিরতির পর দলে ফেরা একজন খেলোয়াড়ের জন্য প্রস্তুতি পর্বটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাচে নামার আগে অনুশীলনে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া জাকেরের জন্য ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০০ রানের উইকেট থেকে ১৪০ রানের লড়াই—সবকিছুর প্রস্তুতি

বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে কেবল একটি ধরনের উইকেটকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আশরাফুলের বক্তব্যে সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।

তিনি জানান, জাপানে মেয়েদের ক্রিকেটের ম্যাচগুলোতে ২০০ রানের বেশি সংগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সেখানে ব্যাটে বল ভালোভাবে আসছে এবং দ্রুতগতির আউটফিল্ডের কারণে বাউন্ডারি পাওয়ার সুযোগও বেশি।

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে রান ১৪০-এর ঘরে আটকে ছিল। ভেজা আউটফিল্ডের কারণে বাউন্ডারি আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে একই ধরনের ব্যাটিং সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পরিবেশ ও মাঠের পরিস্থিতির কারণে রানসংখ্যায় পার্থক্য তৈরি হতে পারে—প্রস্তুতিতে সেই বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

ভালো ব্যাটিং উইকেট হলে কীভাবে ২০০ বা তার বেশি রান করা যায়, আবার মন্থর উইকেটে ১৪০ থেকে ১৬০ রান করেও কীভাবে ম্যাচে লড়াই করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ।

কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার সঙ্গে কোচিং স্টাফদের যোগাযোগ থাকার কথাও জানিয়েছেন আশরাফুল। সম্ভাব্য উইকেটের ধরন সম্পর্কে ধারণা নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা সাজানোর চেষ্টা চলছে।

সাদমানের রানে ফেরার অপেক্ষা

টেস্ট ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে সাদমান ইসলাম প্রত্যাশিত ছন্দে নেই। তবে তার সামর্থ্য নিয়ে আশাবাদী আশরাফুল।

বাংলাদেশের হয়ে ৩০টি টেস্ট খেলা সাদমান দীর্ঘ সময় ধরে মূলত এই ফরম্যাটেই মনোযোগ দিয়ে আসছেন। তার টেস্ট ক্যারিয়ারে রয়েছে দুটি সেঞ্চুরি। কয়েক ইনিংস আগেই আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টানা দুটি ৮০ রানের ইনিংসও খেলেছেন তিনি।

তাই সাম্প্রতিক কিছু ইনিংসে রান না পাওয়াকে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন না আশরাফুল। সাদমান নেটে নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম করছেন এবং ব্যাটিংয়ের যেসব জায়গায় টেকনিক্যাল সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা করছেন।

দীর্ঘ টেস্ট অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সাদমান দ্রুতই রানে ফিরবেন বলে আশা করছেন ব্যাটিং কোচ।

আফগানিস্তান সিরিজের আগে বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে তাই একাধিক দিক একসঙ্গে গুরুত্ব পাচ্ছে। স্পিন সামলানোর অনুশীলনের পাশাপাশি ভালো উইকেটে বড় সংগ্রহ গড়া, মন্থর পিচে ধৈর্য ধরে ব্যাটিং করা এবং বোলারদের দীর্ঘ স্পেল করার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে কন্ডিশন যেমনই হোক, তার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার জন্যই নিজেদের প্রস্তুত করছে বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন