সংযুক্ত আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজের শুরুতেই বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৯৯ রানের ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট শুরু করা দলটির ব্যাটিং ব্যর্থতা আবারও সামনে এসেছে। একপর্যায়ে ম্যাচে জয়ের সম্ভাবনা জাগলেও শেষ পর্যন্ত চাপ সামলাতে না পেরে দ্রুত উইকেট হারিয়েছে বাংলাদেশ। পেসার তাসকিন আহমেদের মতে, ব্যাটিংয়ে কার্যকর জুটি গড়তে না পারা এবং চাপের মুখে ভেঙে পড়াই এই পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
জিম্বাবুয়ের দেওয়া ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা খুব একটা খারাপ ছিল না। ইনিংসের ১৬ ওভার শেষে তিন উইকেট হারিয়ে দলের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৯৪ রান। তখনো ম্যাচে ফেরার সুযোগ ছিল। ক্রিজে ছিলেন সাইফ হাসান ও তাওহীদ হৃদয়। প্রয়োজনীয় রান তোলার গতিও এমন ছিল যে, দায়িত্বশীল ব্যাটিং চালিয়ে যেতে পারলে জয় অসম্ভব ছিল না।
কিন্তু এরপরই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। পরের ১৭.৪ ওভারে বাকি সাত উইকেট হারিয়ে মাত্র ১৭২ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। ফলে ৯৯ রানের বড় ব্যবধানে জয় তুলে নেয় জিম্বাবুয়ে। মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট ধরে রাখতে না পারা, ডট বলের চাপ এবং নিয়মিত বিরতিতে ব্যাটসম্যানদের বিদায়—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রান তাড়ার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
ম্যাচ শেষে তাসকিন মনে করেন, উইকেটের পরিস্থিতি বিবেচনায় এই লক্ষ্য তাড়া করা সম্ভব ছিল। তাঁর মতে, পিচে রান করার সুযোগ ছিল এবং দীর্ঘ সময় ক্রিজে থেকে ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার পরিবেশও ছিল। কিন্তু ব্যাটসম্যানরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি।
তাসকিন বলেন, ‘এই পিচে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করা সম্ভব। এখানে রান করার সুযোগ ছিল এবং চাইলে বড় জুটিও গড়ে তোলা যেত। প্রতিপক্ষ সেটি করেও দেখিয়েছে।’
জিম্বাবুয়ের ঘুরে দাঁড়ানোই বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
ম্যাচে দুই দলের ব্যাটিংয়ের পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। শুরুতেই ২৬ রানে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে জিম্বাবুয়ে। তবে প্রাথমিক বিপর্যয় সামলে দলকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিন। তাঁদের ১৫০ রানের জুটি ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। শুরুতে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়লেও তাঁরা ধৈর্য ধরে ব্যাটিং করেছেন এবং সুযোগ বুঝে রান তুলেছেন।
জিম্বাবুয়ের এই ঘুরে দাঁড়ানোর বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা চাপের মুখে নিজেদের ধরে রাখতে পারেননি। একটি ভালো জুটি ইনিংসকে স্থিতিশীল করতে পারত, পাশাপাশি পরের ব্যাটসম্যানদের জন্যও কাজ সহজ করে দিত। কিন্তু নিয়মিত উইকেট হারানোর কারণে বাংলাদেশ কখনোই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।
তাসকিনের ভাষায়, ‘সত্যি বলতে, আজকের পিচের কথা বিবেচনা করলে ২৭০ রান অবশ্যই তাড়া করার মতো ছিল। আমরাও এই পিচে বোলিং করেছি। দেখেছি, সামান্য ভুল হলেই প্রতিপক্ষ তার সুযোগ নিয়েছে।’
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে কেবল বড় শট খেলার সক্ষমতা নয়, পরিস্থিতি বুঝে ধৈর্য ধরে খেলার মানসিকতাও জরুরি। ওয়ানডে ক্রিকেটে রান তাড়ার সময় দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি উইকেট বাঁচিয়ে রাখার ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। একের পর এক উইকেট হারালে প্রয়োজনীয় রানরেট নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ম্যাচ জেতা কঠিন হয়ে পড়ে।
আমিরাতের কন্ডিশনে জেতা উচিত ছিল, বলছেন তাসকিন
জিম্বাবুয়ের নিজেদের মাঠে খেলা কঠিন বলে স্বীকার করেছেন তাসকিন। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কন্ডিশনে বাংলাদেশের জয় পাওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, প্রতিপক্ষের শক্তি কিংবা পরিবেশকে দায়ী করার চেয়ে নিজেদের পারফরম্যান্সের ঘাটতি চিহ্নিত করা বেশি জরুরি।
এ প্রসঙ্গে তাসকিন বলেন, ‘জিম্বাবুয়ের মাটিতে খেলা কঠিন। তারা নিজেদের কন্ডিশনে অস্ট্রেলিয়াকেও যথেষ্ট চাপে ফেলেছে। তবে এ কন্ডিশনে আমাদের রান তাড়া করে জেতা উচিত ছিল। আমরা আসলে ভালো খেলতে পারিনি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ব্যাটিংয়ে আমরা কোনো কার্যকর জুটি গড়তে পারিনি। অন্তত একটি ভালো জুটি গড়তে পারলেও ম্যাচটি জেতা সম্ভব হতো।’
তাসকিনের এই মূল্যায়ন বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের পুরোনো দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে। চাপের মুখে উইকেট ধরে রাখা, মাঝের ওভারগুলোতে ইনিংসের গতি বজায় রাখা এবং একজন ব্যাটসম্যানের সঙ্গে আরেকজনের সমন্বয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দলটির আরও উন্নতি প্রয়োজন।
একই ভুলের পুনরাবৃত্তি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সবশেষ চার ওয়ানডের কোনোটিতেই পুরো ৫০ ওভার ব্যাটিং করতে পারেনি বাংলাদেশ। এই পরিসংখ্যান দলের ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ওয়ানডে ক্রিকেটে শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং করতে পারা সব সময় জয়ের নিশ্চয়তা দেয় না, তবে ইনিংসের শেষভাগ পর্যন্ত উইকেট হাতে থাকলে রান তোলার সুযোগ বাড়ে এবং বড় লক্ষ্য তাড়া করার পথও সহজ হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট হয়ে উঠেছে চাপের মুহূর্তে। শুরুতে উইকেট হারালে ইনিংস পুনর্গঠন করা এবং মাঝের ওভারগুলোতে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করে রান তোলার যে কৌশল প্রয়োজন, তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি দলটি। ফলে জয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে।
ব্যাটিংয়ে একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন তাসকিন। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, শুধু একটি ম্যাচের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠাই যথেষ্ট নয়; ধারাবাহিকভাবে চাপ সামলানোর সক্ষমতা গড়ে তোলাও জরুরি।
ত্রিদেশীয় সিরিজের বাকি ম্যাচগুলোতে ভালো করতে হলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বশীলতা, ধৈর্য এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ওপর জোর দিতে হবে। উইকেটের মূল্য বুঝে খেলা এবং বিপর্যয়ের সময় ঠান্ডা মাথায় ইনিংস এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি দেখিয়েছে, লক্ষ্য নাগালের মধ্যে থাকলেও কার্যকর জুটি গড়তে না পারলে জয় হাতছাড়া হতে পারে।