চট্টগ্রামের স্থানীয় ক্রিকেটে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং উদীয়মান খেলোয়াড়দের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতে শুরু হচ্ছে ‘চট্টগ্রাম ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট টি-টোয়েন্টি লীগ (সিএফএল) ২০২৬’। ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজির অংশগ্রহণে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টের প্লেয়ার্স ড্রাফট ও গালা নাইট সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ২২ অক্টোবর চট্টগ্রামের সাগরিকার বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হবে মাঠের লড়াই। প্রতিদিন দুটি করে ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নগরের বহদ্দারহাট-সংলগ্ন সিকো এরিনায় স্পোর্টিফাই ইভেন্টসের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় গালা নাইট ও প্লেয়ার্স ড্রাফট। অনুষ্ঠানে টুর্নামেন্টের প্রচারচিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি উন্মোচন করা হয় চ্যাম্পিয়ন ট্রফি। এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর, বিসিবি কাউন্সিলর শহিদুর রহমান এবং অংশগ্রহণকারী ছয় ফ্র্যাঞ্চাইজির স্বত্বাধিকারীরা।
আয়োজকদের লক্ষ্য, স্থানীয় ক্রিকেটারদের জন্য নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের সুযোগ তৈরি করা এবং চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা আনা। বিশেষ করে প্রিমিয়ার লীগ ও প্রথম বিভাগের খেলোয়াড়দের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিশীল তরুণদের নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ করে দিতে চায় আয়োজক প্রতিষ্ঠান। ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে দল গঠন এবং নির্ধারিত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা এই আয়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ছয় ফ্র্যাঞ্চাইজির ৯০ ক্রিকেটারের স্কোয়াড
এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে ব্রাদার্স ইউনিয়ন, বেঙ্গল স্টার্স ক্রিকেট ক্লাব, এনএসটি স্পোর্টস, রাইয়ান স্পোর্টস, আম্বিয়া স্পোর্টস ও বাকলিয়া অগ্রসর বয়েজ ক্লাব। প্লেয়ার্স ড্রাফটের মাধ্যমে ছয়টি দলের খেলোয়াড় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।
ড্রাফট কমিশনার রবিউল হক চৌধুরীর পরিচালনায় সফটওয়্যারভিত্তিক পদ্ধতিতে ১৩ রাউন্ডের ড্রাফট অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি খেলোয়াড় নির্বাচনের জন্য দলগুলোকে ৯০ সেকেন্ড সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি ১৫ জন করে ক্রিকেটার নিয়ে স্কোয়াড গঠন করেছে। সে হিসাবে ছয় দলের স্কোয়াডে মোট ৯০ জন ক্রিকেটার রয়েছেন।
প্রতিটি দলের স্কোয়াড সাজানো হয়েছে চারটি শ্রেণিতে। এতে দুজন ডিরেক্ট সাইনিং, প্রিমিয়ার লীগ থেকে নয়জন, প্রথম বিভাগ থেকে তিনজন এবং একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ক্রিকেটার বা ‘প্রমিজিং স্টার’ রয়েছেন। এই কাঠামোর মাধ্যমে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সঙ্গে তরুণদের একই প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মৌসুমে প্রিমিয়ার লীগ, প্রথম বিভাগ ও দ্বিতীয় বিভাগে খেলা ক্রিকেটারদের তালিকা বিবেচনায় নিয়ে দল গঠন করা হয়েছে। ফলে স্থানীয় ক্রিকেটের বিভিন্ন স্তরে খেলা ক্রিকেটারদের সামনে ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ক্রিকেটারদের জন্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক
সিএফএল আয়োজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো খেলোয়াড়দের শ্রেণিভেদে পারিশ্রমিক নির্ধারণ। ডিরেক্ট সাইনিংয়ের ক্রিকেটাররা পাবেন ৪০ হাজার টাকা করে। প্রিমিয়ার লীগের খেলোয়াড়দের জন্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক ২৫ হাজার টাকা, প্রথম বিভাগের খেলোয়াড়দের জন্য ১৫ হাজার টাকা এবং প্রমিজিং স্টারদের জন্য ১০ হাজার টাকা।
এই ব্যবস্থা স্থানীয় ক্রিকেটারদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক খেলোয়াড়কে ক্রিকেটের পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের বিষয়টিও সামলাতে হয়। সে ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে পারিশ্রমিক পাওয়ার সুযোগ তাঁদের ক্রিকেটচর্চা অব্যাহত রাখতে সহায়ক হতে পারে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য শুধু একটি টুর্নামেন্ট আয়োজনই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা, মানসম্মত ম্যাচ আয়োজন, খেলোয়াড়দের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ মৌসুমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। সিএফএল সেই ধারাবাহিকতা গড়ে তুলতে পারে কি না, সেটিই হবে আয়োজনটির বড় পরীক্ষা।
সব ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচারের প্রতিশ্রুতি
টুর্নামেন্টের টাইটেল স্পনসর হিসেবে রয়েছে ফোরএইচ গ্রুপ। অন্যদিকে, এনএইচটি স্পোর্টসের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. তানসির প্রতিটি ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মাঠে উপস্থিত হতে না পারা দর্শকেরাও ম্যাচ উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি স্থানীয় ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স বৃহত্তর দর্শকগোষ্ঠীর সামনে তুলে ধরার পথ তৈরি হবে। বিশেষ করে তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য নিজেদের দক্ষতা ও সম্ভাবনা তুলে ধরতে সরাসরি সম্প্রচার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সম্প্রচারের পাশাপাশি খেলার মান, মাঠের পরিবেশ এবং আয়োজনের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখতে হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচের পাশাপাশি প্রতিযোগিতার নির্ভরযোগ্য আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে।
২২ অক্টোবর থেকে শুরু মাঠের লড়াই
আগামী ২২ অক্টোবর সাগরিকার বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হবে সিএফএল ২০২৬। প্রতিদিন দুটি করে ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা থাকায় প্রতিযোগিতার সূচিতে ব্যস্ততা থাকবে। ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যে কোন দল নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণ করে শিরোপার পথে এগিয়ে যায়, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে মাঠের লড়াই পর্যন্ত।
এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের স্থানীয় ক্রিকেটে নতুন প্রতিযোগিতামূলক পরিসর তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের উদ্যম একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে টুর্নামেন্টটি দর্শকদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
সিএফএলের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে মাঠের পারফরম্যান্স, আয়োজনের মান এবং ক্রিকেটারদের জন্য তৈরি সুযোগ কতটা কার্যকর হয় তার ওপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিযোগিতা সম্পন্ন হলে চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে, যা ভবিষ্যতে স্থানীয় পর্যায়ে আরও প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট আয়োজনের পথও তৈরি করবে।