নাজমুলের ব্যাটিং উন্নয়নে মাইক হাসির পরামর্শ

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট শেষ হওয়ার পরও বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকে ঘিরে গণমাধ্যমকর্মীদের অপেক্ষা শেষ হচ্ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের সংবাদ সম্মেলন অনেক আগেই শেষ হয়েছে। আয়োজক দেশের সংবাদকর্মীরাও দিনের কাজ গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলন তখনও বাকি।

এরই মধ্যে ড্রেসিংরুমের সামনে ভিন্ন এক দৃশ্য নজরে আসে। ডাগআউটে বসে কোট-প্যান্ট পরা এক ব্যক্তির সঙ্গে গভীর মনোযোগে কথা বলছিলেন নাজমুল। কিছুটা দূরে ছিলেন বাংলাদেশ দলের গণমাধ্যম ব্যবস্থাপক। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, কোনো সম্প্রচারমাধ্যমের সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সেখানে কোনো ক্যামেরা বা আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার সরঞ্জাম ছিল না।

পরে জানা যায়, নাজমুলের সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিটি অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকা ব্যাটার মাইক হাসি। সংবাদ সম্মেলনে যাওয়ার আগে প্রায় ২৫ মিনিট তাঁর সঙ্গে একান্তে কথা বলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

এই সাক্ষাৎকারের উদ্যোগও ছিল নাজমুলের। সিরিজ চলাকালে মাঠে নিয়মিতই হাসির সঙ্গে তাঁর দেখা হচ্ছিল। সেই পরিচিতির সূত্র ধরেই টেস্ট শেষ হওয়ার পর কিছু সময় দেওয়ার অনুরোধ করেন নাজমুল। হাসিও তাতে সম্মতি দেন। এরপর দুজনের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলে ক্রিকেট নিয়ে ব্যক্তিগত আলোচনা।

আলোচনার খুঁটিনাটি প্রকাশ করতে চাননি নাজমুল। তবে তিনি জানিয়েছেন, মূলত নিজের ব্যাটিং এবং ক্রিকেটার হিসেবে আরও উন্নতি করার বিষয়েই হাসির সঙ্গে কথা বলেছেন। নিজের খেলায় কোন জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আনা দরকার, কীভাবে ব্যাটিংকে আরও কার্যকর করা যায় এবং ভবিষ্যতে একজন আরও পরিণত ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা সম্ভব—এসব বিষয়ই ছিল আলোচনার কেন্দ্রে।

নাজমুলের কাছে এই আলোচনা যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, সেটি তাঁর দীর্ঘদিনের ক্রিকেটীয় পছন্দের দিকটিও দেখলে বোঝা যায়। ছোটবেলা থেকেই মাইক হাসি তাঁর প্রিয় ক্রিকেটারদের একজন। হাসির ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর মধ্যে নাজমুল বিশেষভাবে পছন্দ করেন ধারাবাহিকতা, পরিস্থিতি বুঝে খেলার ক্ষমতা এবং ইনিংসকে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়ার দক্ষতা।

হাসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও সেই গুণগুলোরই প্রতিফলন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৭৯ টেস্টে তিনি ৬ হাজার ২৩৫ রান করেছেন, ব্যাটিং গড় ৫১.৫২। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর সেঞ্চুরি ১৯টি। ওয়ানডেতে ১৮৫ ম্যাচে তাঁর সংগ্রহ ৫ হাজার ৪৪২ রান, গড় ৪৮.১৫। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতেও তিনি ছিলেন কার্যকর; ৩৮ ম্যাচে করেছেন ৭২১ রান, ব্যাটিং গড় ৩৭.৯৪।

তবে হাসির মূল্য শুধু তাঁর পরিসংখ্যানে নয়। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে তিনি শান্ত স্বভাব, পরিশ্রম, দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং চাপের পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতার জন্যও পরিচিত ছিলেন। দলের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের ব্যাটিংয়ের ধরন বদলে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর অন্যতম শক্তি। দীর্ঘ সময় ক্রিজে থেকে রান করার পাশাপাশি ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে ঝুঁকি নেওয়া বা নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন দক্ষ।

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অনেক তারকা ক্রিকেটারকেই বিভিন্ন দায়িত্বে মাঠে দেখা গেছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মার্ক ওয়াহ, মার্ভ হিউজ, রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, জেসন গিলেস্পি ও সাইমন ক্যাটিচ। তাঁদের মতো একাধিক কিংবদন্তির উপস্থিতির মধ্যেও নাজমুল ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ নেওয়ার জন্য হাসিকেই বেছে নিয়েছেন। এর পেছনে তাঁর দীর্ঘদিনের অনুপ্রেরণার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

অস্ট্রেলিয়া সফরের মাঠের ফল অবশ্য সব সময় বাংলাদেশের পক্ষে যায়নি। ম্যাকাইয়ের টেস্টে মাত্র দুই দিনের মধ্যে বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে বাংলাদেশকে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন পরাজয় দলের জন্য নিঃসন্দেহে কঠিন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে ব্যাটিং ব্যর্থতা ও ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো কাজে লাগাতে না পারা নিয়ে দলের সামনে ছিল আত্মসমালোচনার সুযোগ।

তবে একটি টেস্টের ফল দিয়েই পুরো সফরকে বিচার করা যায় না। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চার দিনের মধ্যে ৯ উইকেটে টেস্ট জয়, সিরিজ ড্র করা এবং বাংলাদেশের পেসারদের কার্যকর পারফরম্যান্সও এই সফরের গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে রয়েছে। কঠিন কন্ডিশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য ভবিষ্যতের সিরিজগুলোতে কাজে লাগতে পারে।

সেই অভিজ্ঞতার মধ্যেই নাজমুলের জন্য আলাদা হয়ে থাকল মাইক হাসির সঙ্গে ২৫ মিনিটের কথোপকথন। একজন অধিনায়ক হিসেবে শুধু দলের ফলাফল নয়, নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির দিকেও নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। আর নিজের প্রিয় ক্রিকেটারের কাছ থেকে ব্যাটিং নিয়ে সরাসরি পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ সেই উন্নতির পথকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

ক্রিকেটে একজন খেলোয়াড়ের বিকাশ কেবল মাঠের অনুশীলন বা ম্যাচ খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের কাছ থেকে শেখা, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা করাও দীর্ঘ ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাজমুলের এই উদ্যোগ সেই মানসিকতারই প্রকাশ।

অস্ট্রেলিয়া সফরের কঠিন সময়ের মাঝেও তাই মাইক হাসির সঙ্গে ওই আলাপ নাজমুলের জন্য ছিল বিশেষ এক অভিজ্ঞতা। প্রিয় ক্রিকেটারের অভিজ্ঞতা থেকে নিজের ব্যাটিং নিয়ে শেখার এই সুযোগ ভবিষ্যতে তাঁর খেলায় কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটি সময়ই বলবে। তবে উন্নতির জন্য নিজে থেকে পরামর্শ চাওয়ার মানসিকতা একজন ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত বিকাশে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

মন্তব্য করুন