সিডনিতে অনুষ্ঠিত বাংলা হান্ড্রেড লিগের প্রথম আসরের শিরোপা উঠেছে কুমিল্লা সুপার স্টারসের হাতে। রুদ্ধশ্বাস এক ফাইনালে চিটাগং কিংসকে ৫ উইকেটে হারিয়ে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে দলটি। শেষ ওভার পর্যন্ত টানটান উত্তেজনায় ভরা ম্যাচে কখনো চিটাগং কিংস, আবার কখনো কুমিল্লা সুপার স্টারস নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও শেষ পর্যন্ত এক বল হাতে রেখেই জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় কুমিল্লা।
টস হেরে প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় চিটাগং কিংস। দ্রুত একটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে দলটি। সেই কঠিন পরিস্থিতিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন অধিনায়ক কৌরাব আক্তার। শুরুতে ধৈর্য ধরে ইনিংস গড়লেও পরে তিনি আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ম্যাচের গতি বদলে দেন। প্রতিপক্ষ বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে ৪২ বলে ৭৬ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেন তিনি। তার ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ৩টি ছক্কা। অন্য প্রান্তে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারালেও কৌরাবের দৃঢ় ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করে নির্ধারিত ওভার শেষে ৭ উইকেটে ১৪২ রানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংগ্রহ গড়ে চিটাগং কিংস।
১৪৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে আত্মবিশ্বাসী সূচনা করে কুমিল্লা সুপার স্টারস। উদ্বোধনী জুটিতে লাবিব মাহবুব ও মেহেদী হাসান ইফতি দলকে দারুণ ভিত এনে দেন। শুরু থেকেই ইতিবাচক মানসিকতায় ব্যাটিং করে তারা প্রয়োজনীয় রানগতিও ধরে রাখেন। লাবিব ২৮ রান করে বিদায় নিলেও অপর প্রান্তে অনড় থাকেন ইফতি। ইনিংসজুড়ে পরিমিত ঝুঁকি নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সময়ে বড় শট খেলেও তিনি দলকে এগিয়ে রাখেন। মাত্র ৩০ বলে ৬৬ রানের ঝলমলে ইনিংসে ছিল আক্রমণ ও দায়িত্বশীলতার দুর্দান্ত সমন্বয়। তার ব্যাটিংই মূলত কুমিল্লার রান তাড়ার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
তবে ম্যাচের শেষদিকে হঠাৎ করেই জমে ওঠে লড়াই। জয়ের পথ অনেকটাই সহজ মনে হলেও দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে কুমিল্লা। সেই সুযোগে ম্যাচে দারুণভাবে ফিরে আসে চিটাগং কিংস। শেষ পাঁচ বলে প্রয়োজন ছিল ৫ রান। মাঠে থাকা ক্রিকেটারদের পাশাপাশি গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শক এবং দুই দলের সমর্থকদের মধ্যেও তখন বিরাজ করছিল চরম উত্তেজনা। প্রতিটি বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল রোমাঞ্চ। শেষ পর্যন্ত স্নায়ুচাপ সামলে প্রয়োজনীয় রান তুলে নেয় কুমিল্লা সুপার স্টারস এবং এক বল বাকি থাকতেই নিশ্চিত করে স্মরণীয় জয়।
ফাইনালে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন মেহেদী হাসান ইফতি। তার ৬৬ রানের কার্যকর ইনিংসই দলকে শিরোপার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। অন্যদিকে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ব্যাট ও বল হাতে ধারাবাহিক নৈপুণ্য প্রদর্শনের স্বীকৃতি হিসেবে কুমিল্লা সুপার স্টারসের অধিনায়ক তানজিলুর রহমান পান আসরের সেরা খেলোয়াড়ের সম্মান। তিনি ১০টি উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিও হন। অপরদিকে রানসংগ্রহে সবার ওপরে ছিলেন চিটাগং কিংসের অধিনায়ক কৌরাব আক্তার। পুরো আসরে ২৫০ রান করে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। শিরোপা হাতছাড়া হলেও তার ধারাবাহিক ও পরিণত ব্যাটিং প্রশংসিত হয়েছে ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে।
প্রথমবারের মতো আয়োজিত বাংলা হান্ড্রেড লিগ কেবল একটি ক্রিকেট প্রতিযোগিতাই ছিল না; এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ছিল মিলনমেলা ও ক্রীড়া উৎসবের একটি বড় আয়োজন। সিডনিতে বসবাসরত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বিপুল উপস্থিতি পুরো আসরকে প্রাণবন্ত করে তোলে। পরিবার-পরিজন নিয়ে গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদের উচ্ছ্বাস, বিভিন্ন দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই এবং খেলোয়াড়দের প্রতিশ্রুতিশীল পারফরম্যান্স টুর্নামেন্টকে স্মরণীয় করে রাখে।
আয়োজকদের মতে, প্রথম আসরের সফল আয়োজন ভবিষ্যতের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তারা আশা করছেন, আগামী মৌসুমে আরও বেশি দল, নতুন প্রতিভাবান ক্রিকেটার এবং বৃহত্তর পরিসরের আয়োজন নিয়ে বাংলা হান্ড্রেড লিগের দ্বিতীয় আসর অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে এই প্রতিযোগিতা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ক্রিকেটচর্চা আরও বিস্তৃত করবে এবং উদীয়মান ক্রিকেটারদের নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার কার্যকর একটি মঞ্চ হিসেবে ভূমিকা রাখবে। প্রথম আসরের সফল সমাপ্তি তাই ভবিষ্যতে আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ, আকর্ষণীয় এবং সমৃদ্ধ বাংলা হান্ড্রেড লিগ আয়োজনের সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।