রশিদের পাঁচ উইকেটের দিনে ছেলের সামনে আবেগঘন সাফল্য

আফগানিস্তানের তারকা লেগস্পিনার রশিদ খান আবারও দেখালেন, কেন বিশ্বের অন্যতম সেরা টি-টোয়েন্টি বোলার হিসেবে তাঁর এতটা কদর। ইংল্যান্ডের ১০০ বলের ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতা ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকারের দিনে বল হাতে তিনি যেমন দলকে বড় জয় এনে দিয়েছেন, তেমনই ব্যক্তিগত জীবনেও পেয়েছেন এক অনন্য স্মৃতি। লন্ডনের ঐতিহাসিক ওভালে ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে রশিদের দুর্দান্ত বোলিং দেখেছে তাঁর মাত্র তিন মাস বয়সী ছেলে আজলান। ম্যাচ শেষে ছেলেকে কোলে তুলে নেওয়া রশিদের সেই মুহূর্ত হয়ে উঠেছে রাতটির সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যগুলোর একটি।

রোববার, ২ আগস্ট ওভালে ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টসের মুখোমুখি হয় এমআই লন্ডন। টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নামা দলটি নির্ধারিত ১০০ বলে ৬ উইকেটে ১৮৩ রানের শক্তিশালী সংগ্রহ গড়ে। ইনিংসকে বড় রানের পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন উইল জ্যাকস ও নিকোলাস পুরান। জ্যাকসের ব্যাট থেকে আসে ৬২ রান, আর পুরান করেন ৫৪ রান। তাঁদের কার্যকর ব্যাটিংয়ের সঙ্গে অন্য ব্যাটারদের অবদানে এমআই লন্ডন এমন একটি সংগ্রহ দাঁড় করায়, যা তাড়া করতে গিয়ে শুরু থেকেই চাপে পড়ে ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টস।

১৮৪ রানের লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাটিংয়ে নেমে ম্যানচেস্টার বড় জুটি গড়তে পারেনি। এমআই লন্ডনের বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নিয়ে প্রতিপক্ষের রান তোলার গতি আটকে দেন। সেই চাপকে চূড়ান্ত বিপর্যয়ে পরিণত করেন রশিদ খান। মাত্র ২০ বলের স্পেলে ১৭ রান খরচ করে পাঁচটি উইকেট শিকার করেন তিনি। তাঁর ঘূর্ণির সামনে ম্যানচেস্টারের ব্যাটিং অর্ডার কার্যত ভেঙে পড়ে।

শেষ পর্যন্ত ৫ বল বাকি থাকতেই ১৩৮ রানে অলআউট হয়ে যায় ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টস। ফলে ৪৫ রানের বড় জয় পায় এমআই লন্ডন। দলের জয়ে রশিদের বোলিং ছিল সবচেয়ে বড় পার্থক্য গড়ে দেওয়া উপাদান। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতে।

এই পারফরম্যান্স রশিদের জন্য বিশেষ হয়ে উঠেছে একাধিক কারণে। ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ এটাই তাঁর প্রথম পাঁচ উইকেট শিকার। চলতি আসরেও তিনিই প্রথম বোলার হিসেবে এক ম্যাচে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন। প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে পাঁচ উইকেট নেওয়া বোলারদের তালিকাতেও এবার যুক্ত হলো তাঁর নাম। অর্থাৎ, বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হওয়া রশিদ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত অর্জন নিজের ঝুলিতে যোগ করলেন।

‘দ্য হান্ড্রেড’-এ এর আগে রশিদের সেরা বোলিং পরিসংখ্যান ছিল ২০২৪ সালের। সে বছর ট্রেন্ট রকেটসের হয়ে লন্ডন স্পিরিটের বিপক্ষে ২৪ রান দিয়ে চার উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। সেই ম্যাচেও দলকে জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছিলেন আফগান এই স্পিনার। এবার এমআই লন্ডনের হয়ে ২০ বলে ১৭ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নিয়ে নিজের আগের সেরা পারফরম্যান্সকে ছাড়িয়ে গেলেন তিনি।

রশিদের পাঁচ উইকেটের এই স্পেল শুধু পরিসংখ্যানের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; তাঁর বোলিংয়ের ধরনও ছিল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। লেগস্পিন, গুগলি, দ্রুতগতির বল এবং ব্যাটসম্যানকে ভুল শট খেলতে বাধ্য করার দক্ষতার কারণে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে রশিদ দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ এক বোলার হিসেবে পরিচিত। ১০০ বলের ক্রিকেটে প্রতিটি ডেলিভারির গুরুত্ব আরও বেশি হওয়ায় তাঁর মতো উইকেট নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন বোলার দলের জন্য বড় সম্পদ। ওভালের ম্যাচে সেই দক্ষতারই পূর্ণ প্রতিফলন দেখা গেছে।

তবে মাঠের সাফল্যের বাইরে রশিদের জন্য দিনটির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল পরিবারের উপস্থিতি। ওভালের গ্যালারিতে ছিলেন তাঁর তিন মাস বয়সী ছেলে আজলান। বাবাকে সরাসরি মাঠে খেলতে দেখার এটিই ছিল তার প্রথম অভিজ্ঞতা। বয়স এত কম যে ম্যাচের উত্তেজনা কিংবা বাবার পাঁচ উইকেটের গুরুত্ব বোঝার সুযোগ তার নেই। কিন্তু রশিদের কাছে ছেলের সেই উপস্থিতি ছিল নিঃসন্দেহে বিশেষ এক অনুভূতি।

ম্যাচ শেষে ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে ছেলেকে কোলে তুলে নেন রশিদ। পরে সেই আবেগঘন মুহূর্তের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন তিনি। আজলানের পরনে ছিল বাবার দলের জার্সি, যেখানে তার নামও লেখা ছিল। ছবির সঙ্গে দেওয়া বার্তায় রশিদ জানান, ছেলের প্রথমবার তাঁকে মাঠে খেলতে দেখা এবং একই দিনে নিজের দলের হয়ে ম্যাচসেরা হওয়া—এই দুই ঘটনা তাঁর কাছে দিনটিকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছে।

ছেলেকে নিজের সবচেয়ে বড় সমর্থক, জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ এবং সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন রশিদ। তাঁর কথায় ফুটে উঠেছে একজন ক্রিকেটারের পাশাপাশি একজন বাবার আবেগও। পেশাদার ক্রিকেটে সাফল্য, রেকর্ড কিংবা ব্যক্তিগত পুরস্কার একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করে; কিন্তু সন্তানের সামনে একটি বিশেষ পারফরম্যান্সের স্মৃতি অনেক সময় ব্যক্তিগত জীবনে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বহন করে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে রশিদ খানের সাফল্যের তালিকা দীর্ঘ। বিশ্বের বিভিন্ন টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নেওয়া এই আফগান তারকা তাঁর নিয়ন্ত্রিত লেগস্পিন, কার্যকর গুগলি এবং চাপের মুহূর্তে উইকেট তুলে নেওয়ার সামর্থ্যের জন্য ব্যাটসম্যানদের কাছে কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত। তাঁর বোলিংয়ের অন্যতম বড় শক্তি হলো, রান আটকে রাখার পাশাপাশি দ্রুত উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা। ওভালে ম্যানচেস্টার সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে পাঁচ উইকেটের পারফরম্যান্স সেই দক্ষতারই আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

একই সঙ্গে রশিদের এই পারফরম্যান্স এমআই লন্ডনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৩ রানের সংগ্রহ গড়ার পর ৪৫ রানের জয় দলটির আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। ব্যাট হাতে জ্যাকস ও পুরানের অবদান যেমন বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেয়, তেমনই বোলিংয়ে রশিদের পাঁচ উইকেট সেই ভিতকে জয়ে রূপ দেয়। ফলে ম্যাচটির দুই দিকেই এমআই লন্ডনের পারফরম্যান্স ছিল কার্যকর।

তবে রশিদের স্মৃতিতে ওভালের এই দিনটি সম্ভবত শুধু পাঁচ উইকেট, ম্যাচসেরার পুরস্কার কিংবা বড় জয়ের জন্যই বিশেষ হয়ে থাকবে না। তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বোলিং পারফরম্যান্সের দিন গ্যালারিতে উপস্থিত ছিল তাঁর ছোট্ট ছেলে। মাঠে বাবা যখন একের পর এক উইকেট তুলে নিচ্ছিলেন, তখন সেই দৃশ্য সরাসরি দেখার সুযোগ হয় আজলানের। ক্রিকেটের রেকর্ড বই হয়তো দিনটিকে রশিদের ‘দ্য হান্ড্রেড’ ক্যারিয়ারের সেরা বোলিংয়ের একটি হিসেবে মনে রাখবে। কিন্তু একজন বাবা হিসেবে রশিদের কাছে এই দিনের মূল্য আরও গভীর—কারণ, সেদিন তিনি শুধু দলকে জেতাননি; নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সমর্থকের উপস্থিতিতে উপহার দিয়েছেন ক্যারিয়ারের একটি স্মরণীয় ক্রিকেটীয় মুহূর্ত।

মন্তব্য করুন