টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে রীতিমতো উড়ছিল ভারত। মাসতিনেক আগে বিশ্বজয়ের মুকুট মাথায় পরা দলটি যখন আয়ারল্যান্ড সফরে যায়, তখন সমর্থক থেকে শুরু করে ক্রিকেট বিশ্লেষক—সবারই ধারণা ছিল ম্যাচের ফলাফল কী হতে যাচ্ছে। সবাই ভেবেছিলেন ভারত মাঠে নামবে, চেনা ছন্দে খেলবে এবং সহজ জয় নিয়ে ফিরবে। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে চিরচেনা সেই চিত্রনাট্য বদলে গেল সম্পূর্ণ উল্টোভাবে। পুচকে আয়ারল্যান্ডের কাছে হোয়াইটওয়াশ হয়ে একেবারে মাটিতে আছড়ে পড়ল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই লজ্জাজনক হারের ফলে ভারতের টানা ১৬টি টি-টোয়েন্টি সিরিজ জেতার রঙিন স্বপ্ন যেমন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, তেমনি দলের রণকৌশল নিয়ে চারদিকে বয়ে যাচ্ছে সমালোচনার তীব্র ঝড়।
সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৩৪ রানে হারার পর, দ্বিতীয় ম্যাচে মাত্র ১ রানে হেরে মাঠ ছাড়ে ভারত। তবে এই হারের বেদনার চেয়েও ক্রিকেটপ্রেমীদের বেশি পুড়িয়েছে দলের নতুন বিস্ময়, তরুণ তুর্কি বৈভব সূর্যবংশীকে একাদশে না রাখা। ভারতের এমন অসহায় আত্মসমর্পণের পর ১৫ বছর বয়সী এই বিধ্বংসী ব্যাটসম্যানকে সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না বিশ্লেষকরা।
এমনকি ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার সুনীল গাভাস্কারও বৈভবকে একাদশে না দেখে চরম বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “আমি আশা করেছিলাম আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি ম্যাচেই দলে থাকবে বৈভব। অভিষেক শর্মা কিংবা সঞ্জু স্যামসনের সঙ্গে বৈভবেরই ওপেন করতে নামা উচিত ছিল।” তবে এই তরুণ প্রতিভার ওপর গাভাস্কারের আস্থা এখনও অটুট। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন ইংল্যান্ড সিরিজেই জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হবে এই তরুণের। গাভাস্কারের ভাষায়, “সে অবশ্যই সুযোগ পাবে। তার মতো বিরল প্রতিভাকে আপনি কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারবেন না।”
নকআউট বা দ্বিপাক্ষিক সিরিজের এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কেন সূর্যবংশীকে একাদশের বাইরে রাখা হলো, তা নিয়ে ক্রিকেট মহলে বিতর্কের শেষ নেই। ভারতের টিম ম্যানেজমেন্টের ভেতরের একটি সূত্র দাবি করছে, মাত্র ১৫ বছর বয়সী এই কিশোর ক্রিকেটারকে আয়ারল্যান্ডের অপরিচিত ও কঠিন কন্ডিশন থেকে আড়ালে রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ম্যানেজমেন্টের যুক্তি ছিল বেশ পরিষ্কার—কিশোর খেলোয়াড়টিকে মানসিক ও শারীরিকভাবে সুরক্ষা দেওয়া। আয়ারল্যান্ডের সবুজ ও স্যাঁতসেঁতে পিচগুলোতে ছিল প্রচুর সুইং, অতিরিক্ত বাউন্স এবং সিম মুভমেন্ট; যা আইপিএলের চেনা ব্যাটিং-বান্ধব উইকেট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
দল পরিচালনাকারীরা হয়তো ভেবেছিলেন, এমন বৈরী পরিস্থিতিতে হুট করে মাঠে নামিয়ে দিলে এই কিশোরের আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সুরক্ষার এই অতিরিক্ত অজুহাত আসলে দলের ভেতরের বড় ধরনের দুর্বলতাগুলোকেই ঢাকতে পারেনি। একজন তরুণ প্রতিভাকে আগলে রাখার ভাবনা দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হলেও, এই সিরিজে তা হিতে বিপরীত হয়েছে। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের এই ভরাডুবি প্রমাণ করেছে যে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক অভিভাবকত্ব মাঝে মাঝে দলের বাকি সদস্যদের অবিশ্বাস্যভাবে অরক্ষিত ও অসহায় করে তোলে।
সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ১ রানে হেরে ট্রফি হাতছাড়া করার পর সংবাদ সম্মেলনে এসে ভারতের সহকারী কোচ রায়ান টেন ডাসকেটকেও এই সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়েছে। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বৈভব আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার জন্য পুরোপুরি তৈরি, এটা নিয়ে আমাদের মনে কোনো সংশয় নেই। আইপিএলে সে যেভাবে খেলেছে, তা দুর্দান্ত। আমরা সবাই আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার ব্যাটিং দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। তবে আর সবার মতো তাকেও একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে।” তিনি উদাহরণ টেনে আরও বলেন, “আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হতে সঞ্জু স্যামসনকেও একটা লম্বা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। আমরা সবাইকে লম্বা সময়ের জন্য সুযোগ দিতে চাই।”
ম্যানেজমেন্ট এখন যতই প্রক্রিয়া আর সুরক্ষার দোহাই দিক না কেন, অজিত আগারকারের নির্বাচন কমিটি কিন্তু বৈভবের পারফরম্যান্স দেখেই তাকে দলে ডেকেছিল। সর্বশেষ আইপিএলে ২৩০ স্ট্রাইক রেটে সর্বোচ্চ ৭৭৬ রান করে নির্বাচকদের বাধ্য করেছিলেন তিনি। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই আইপিএলের মঞ্চে ক্রিস গেইলের সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড ভেঙে ক্রিকেট দুনিয়াকে চমকে দিয়েছিলেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। শুধু আইপিএলই নয়; বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, ঘরোয়া ক্রিকেট এবং ভারত ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা সফর—সবখানেই একের পর এক রেকর্ড ভাঙা পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন বৈভব সূর্যবংশী। আগামী ইংল্যান্ড সফরে যদি তিনি মাঠে নামার সুযোগ পান, তবে শচিন টেন্ডুলকারকে পেছনে ফেলে তিনিই হবেন ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার।