ইংলিশ ক্রিকেটের আধুনিক যুগের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার এবং অধিনায়ক বেন স্টোকসের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিদায়ী মঞ্চটি শেষ পর্যন্ত এক বুক বিষাদে রূপ নিল। ট্রেন্ট ব্রিজে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ও শেষ টেস্টে ১৬০ রানের বড় ব্যবধানে হেরে গেছে স্বাগতিক ইংল্যান্ড। এই চরম পরাজয়ের ফলে তিন ম্যাচের মর্যাদাপূর্ণ টেস্ট সিরিজটি ২-১ ব্যবধানে নিজেদের করে নিল সফরকারী নিউজিল্যান্ড। মাঠের লড়াইয়ে স্টোকস নিজের শেষ ম্যাচে বল হাতে সাধ্যমতো চেষ্টা করলেও, শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের একরাশ গ্লানি নিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে হলো এই ড্যাশিং তারকাকে।
পঞ্চম দিনে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের সামনে লক্ষ্য ছিল ৩৭৩ রানের এক বিশাল পাহাড়। কিন্তু কিউই বোলার ও ফিল্ডারদের নিয়ন্ত্রিত ও আগ্রাসী পারফরম্যান্সের সামনে মাত্র ২১২ রানেই তাসের ঘরের মতো গুটিয়ে যায় ইংলিশদের দ্বিতীয় ইনিংস। ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় নিউজিল্যান্ডের জন্য এই জয়টি এক অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দুই দেশের দীর্ঘ ক্রিকেটীয় লড়াইয়ের ইতিহাসে ইংল্যান্ডের মাটিতে এটি নিউজিল্যান্ডের মাত্র চতুর্থ টেস্ট সিরিজ জয়। একই সঙ্গে ২০১২ সালের পর ঘরের মাঠে তিন বা তার বেশি ম্যাচের কোনো টেস্ট সিরিজে এই প্রথম হারের তেতো স্বাদ পেল ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ড।
ফিল্ডিংয়ের ম্যাজিক ও শেষ দিনের রোমাঞ্চ
ম্যাচের শেষ দিনে চোটে জর্জরিত নিউজিল্যান্ডের বোলিং আক্রমণকে দুর্দান্তভাবে ব্যাক-আপ দিয়েছেন তাদের ফিল্ডাররা। অসাধারণ কিছু ক্যাচ আর বুলেট গতির নিখুঁত থ্রোতে ম্যাচের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পকেটে পুরে নেয় কিউইরা। বিশেষ করে হেনরি নিকোলসের একটি সরাসরি থ্রোতে সাজঘরে ফিরতে হয় ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার জো রুটকে। এরপর মিচেল স্যান্টনারের দুর্দান্ত এক থ্রোতে রান আউটের শিকার হন জশ টং। শেষ দিকে মিডল অর্ডারে উইকেটকিপার ব্যাটার জেমি স্মিথ ৬০ রানের এক লড়াকু ইনিংস খেলে ব্যবধান কমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। তবে বাঁহাতি স্পিনার স্যান্টনারের বলে নাথান স্মিথের হাতে ক্যাচ দিয়ে স্মিথ আউট হতেই ট্রেন্ট ব্রিজে বুনো উল্লাসে মেতে ওঠে নিউজিল্যান্ড।
প্রথম ইনিংসের রান পাহাড় ও ম্যাচের সংক্ষিপ্ত চিত্র
এই টেস্টে নিউজিল্যান্ডের জয়ের মূল ভিত তৈরি হয়েছিল তাদের দুর্দান্ত প্রথম ইনিংসেই। টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে রান পাহাড় গড়েছিল কিউইরা। দুই টপ অর্ডার ব্যাটার ডেভন কনওয়ে ও টম ল্যাথামের ব্যাট থেকে আসে দুটি অসাধারণ দেড় শতাধিক রানের ইনিংস। কনওয়ে খেলেন ১৫৭ রানের ঝকঝকে ইনিংস এবং ল্যাথাম করেন ১৫১ রান। ইংল্যান্ডের হয়ে বল হাতে নিজের শেষ টেস্টে সর্বোচ্চ ৪টি উইকেট শিকার করেন বিদায়ী অধিনায়ক বেন স্টোকস।
জবাবে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ড তোলে ৩৫৪ রান, যেখানে ওপেনার বেন ডাকেট ১১৩ রানের এক চমৎকার সেঞ্চুরি করেন এবং তরুণ জ্যাকব বেথেল খেলেন ৭৪ রানের ইনিংস। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে নিউজিল্যান্ড ৯ উইকেটে ২৮৮ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করলে ইংল্যান্ডের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩৭৩ রান। ড্যারিল মিচেলের অপরাজিত ১০০ এবং রাচিন রবীন্দ্রর ৯৪ রান কিউইদের এই বিশাল লিড এনে দিয়েছিল। জবাবে ২১২ রানে অলআউট হওয়া ইংল্যান্ডের পক্ষে জেমি স্মিথের ৬০ রান ছাড়া আর কোনো ব্যাটার প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। নিউজিল্যান্ডের হয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩টি উইকেট নেন জ্যাক ফোকস। বিদায়বেলায় ম্যাচ হারলেও বেন স্টোকসের দীর্ঘ ক্রিকেটীয় অবদানকে গ্যালারিভর্তি দর্শক ও সতীর্থরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে রাজকীয় সম্মান জানান।
এক নজরে ম্যাচের সংক্ষিপ্ত স্কোর:
-
নিউজিল্যান্ড প্রথম ও দ্বিতীয় ইনিংস: ৪৩৮ (ডেভন কনওয়ে ১৫৭, টম ল্যাথাম ১৫১; বেন স্টোকস ৪/৮২) এবং ২৮৮/৯ ডিক্লে. (ড্যারিল মিচেল ১০০*, রাচিন রবীন্দ্র ৯৪; জো রুট ২/৩৮)
-
ইংল্যান্ড প্রথম ও দ্বিতীয় ইনিংস: ৩৫৪ (বেন ডাকেট ১১৩, জ্যাকব বেথেল ৭৪; গ্লেন ফিলিপস ৩/৬২) এবং ২১২ (জেমি স্মিথ ৬০, ওলি পোপ ৩২; জ্যাক ফোকস ৩/৪৫)
-
ম্যাচের ফলাফল: নিউজিল্যান্ড ১৬০ রানে জয়ী এবং তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজটি ২-১ ব্যবধানে জয়ী।