ভারতের ঘরের মাঠে আগামী ৩৫টি দ্বিপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচকে কেন্দ্র করে বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (বিসিসিআই)। রিলায়্যান্স কনজিউমার প্রোডাক্টসের কোমল পানীয় ব্র্যান্ড ক্যাম্পা কোলা, জীবনবিমা প্রতিষ্ঠান এসবিআই লাইফ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম চ্যাটজিপিটির সঙ্গে চুক্তি করেছে বোর্ড। এসব অংশীদারিত্ব থেকে ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বিসিসিআইয়ের আয় হবে মোট ১২৯ কোটি ৮৫ লাখ রুপি।
চুক্তির আওতায় তিন প্রতিষ্ঠানই ভারতীয় দলের ঘরের মাঠের দ্বিপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচে অ্যাসোসিয়েট পার্টনার হিসেবে যুক্ত থাকবে। অর্থাৎ ম্যাচগুলোকে ঘিরে বিসিসিআইয়ের নির্ধারিত বাণিজ্যিক পরিসরে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্র্যান্ড প্রচারের সুযোগ থাকবে। ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের বিপুল দর্শকভিত্তি এবং ঘরের মাঠের আন্তর্জাতিক ম্যাচের নিয়মিত আয়োজন এ ধরনের অংশীদারিত্বকে ব্যবসায়িক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
দরপত্রে সবচেয়ে বেশি দর দিয়েছে ক্যাম্পা কোলা। প্রতি ম্যাচের জন্য প্রতিষ্ঠানটি বিসিসিআইকে দেবে ১ কোটি ৩১ লাখ রুপি। ৩৫টি ম্যাচের পুরো সময়ের হিসাবে ক্যাম্পা কোলার কাছ থেকে বোর্ডের আয় হবে ৪৫ কোটি ৮৫ লাখ রুপি।
অ্যাসোসিয়েট পার্টনার হওয়ার দৌড়ে ক্যাম্পা কোলার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বিসলেরি ও ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন (আইওসি)। এই দুই প্রতিষ্ঠান ম্যাচপ্রতি ১ কোটি ২০ লাখ রুপি করে দর দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ দর দেওয়ায় ক্যাম্পা কোলাই বাণিজ্যিক স্বত্বটি পায়।
অন্যদিকে এসবিআই লাইফ ও চ্যাটজিপিটি—দুই প্রতিষ্ঠানই ম্যাচপ্রতি ১ কোটি ২০ লাখ রুপি করে দেবে। ৩৫ ম্যাচে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিসিসিআই পাবে ৪২ কোটি রুপি। ফলে তিন প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মোট মূল্য দাঁড়াচ্ছে ১২৯ কোটি ৮৫ লাখ রুপি।
হিসাবটি দেখলে ক্যাম্পা কোলার চুক্তিমূল্যই তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ম্যাচপ্রতি তাদের দেওয়া অর্থ এসবিআই লাইফ ও চ্যাটজিপিটির চেয়ে ১১ লাখ রুপি বেশি। তবে ৩৫ ম্যাচের পুরো মেয়াদে তিনটি চুক্তি মিলিয়েই বোর্ডের আয় প্রায় ১৩০ কোটি রুপিতে পৌঁছাচ্ছে।
চুক্তিটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিন অংশীদার তিন ভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক খাতের প্রতিনিধিত্ব করছে। ক্যাম্পা কোলা কোমল পানীয় ও ভোক্তা পণ্যের বাজারে সক্রিয়। এসবিআই লাইফ জীবনবিমা খাতের প্রতিষ্ঠান। আর চ্যাটজিপিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম। ফলে ক্রিকেটের বাণিজ্যিক পরিসরে ভোক্তা পণ্য, আর্থিক সেবা ও প্রযুক্তি—তিন খাতের ব্র্যান্ডের উপস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে এই তিনটি চুক্তি হলেও বিসিসিআইয়ের বাণিজ্যিক পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এখনো পূরণ হয়নি। সেটি হলো টাইটেল স্পনসর। আগের টাইটেল স্পনসর আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাংকের সঙ্গে বিসিসিআইয়ের চুক্তি ২০২৬ সালের আগস্টে শেষ হয়েছে। এরপর নতুন টাইটেল স্পনসর খুঁজছে বোর্ড।
টাইটেল স্পনসরশিপ বিসিসিআইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পদ। কারণ ভারতের ঘরের মাঠের আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোর সঙ্গে এই ব্র্যান্ডিংয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকে। জাতীয় দলের ম্যাচকে ঘিরে যে বিপুল দর্শক আগ্রহ তৈরি হয়, সেটিই স্পনসর প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় পরিসরে ব্র্যান্ড প্রচারের সুযোগ তৈরি করে।
নতুন অংশীদার খুঁজতে জুলাইয়ে দরপত্র আহ্বান করেছিল বিসিসিআই। টাইটেল স্পনসর ও অ্যাসোসিয়েট পার্টনার—দুই ধরনের বাণিজ্যিক স্বত্বের জন্যই দরপত্র ডাকা হয়েছিল। টাইটেল স্পনসরশিপের জন্য প্রাথমিকভাবে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত এবং অ্যাসোসিয়েট পার্টনারদের জন্য ২৫ আগস্ট পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়। পরে অ্যাসোসিয়েট পার্টনারদের ক্ষেত্রে সময়সীমা বাড়িয়ে ৭ সেপ্টেম্বর করা হয়।
নতুন তিন অ্যাসোসিয়েট পার্টনারের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় বিসিসিআইয়ের বাণিজ্যিক অংশীদারদের তালিকায় বৈচিত্র্যও এসেছে। বিশেষ করে চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের যুক্ত হওয়া ক্রিকেটের স্পনসরশিপ বাজারে প্রযুক্তি খাতের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের দিকটি সামনে এনেছে।
ভারতের ক্রিকেটে বাণিজ্যিক স্বত্বের মূল্য মূলত নির্ভর করে জাতীয় দলের জনপ্রিয়তা, ঘরের মাঠে ম্যাচের সংখ্যা এবং বিশাল দর্শকভিত্তির ওপর। ফলে ৩৫টি ম্যাচের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারা বিসিসিআইয়ের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে এসব চুক্তি বোর্ডের নিয়মিত বাণিজ্যিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিশ্চিত করেছে।
সব মিলিয়ে আগামী ৩৫টি ঘরের মাঠের দ্বিপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচ থেকে প্রায় ১৩০ কোটি রুপি আয় নিশ্চিত করেছে বিসিসিআই। এখন বোর্ডের সামনে বড় লক্ষ্য নতুন টাইটেল স্পনসর চূড়ান্ত করা। সেই স্বত্বে আকর্ষণীয় কোনো চুক্তি হলে ভারতের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ঘিরে বিসিসিআইয়ের বাণিজ্যিক আয় আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।