অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগেই বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের বড় দুর্বলতা সামনে চলে এসেছে। ডারউইনের মারারা ওভালে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে ইনিংস ও ৩৮ রানে হেরেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। প্রথম ইনিংসে ২৬৩ রান করে কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিলেও দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। ফলে ম্যাচের শুরুতে তৈরি হওয়া ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগও আর থাকেনি।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তাঁর সেঞ্চুরিই মূলত দলকে ২৬৩ রানে পৌঁছাতে সাহায্য করে। কিন্তু মিরাজ ছাড়া আর কোনো ব্যাটসম্যান পঞ্চাশের ঘর পেরোতে পারেননি। বড় জুটি গড়ে ওঠেনি, উইকেটে টিকে থেকে ইনিংসকে এগিয়ে নেওয়ার মতো ধারাবাহিকতাও দেখা যায়নি। ব্যক্তিগতভাবে মিরাজের ইনিংস আশাব্যঞ্জক হলেও দলীয় ব্যাটিংয়ের সামগ্রিক চিত্র ছিল উদ্বেগের।
বাংলাদেশের ২৬৩ রানের জবাবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ ৩৫৫ রান করে। ফলে প্রথম ইনিংসে ৯২ রানের লিড পায় তারা। প্রস্তুতি ম্যাচের বিবেচনায় এই ব্যবধান খুব বড় মনে না হলেও দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সামনে ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ২ উইকেটে ১৯ রান। হাতে তখনও ছিল আটটি উইকেট। শেষ দিনে কয়েকটি বড় জুটি গড়ে তুলতে পারলে ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই হয়নি।
তৃতীয় দিনের শুরুতেই বাংলাদেশের ব্যাটিং দ্রুত ভেঙে পড়ে। মাত্র ১৭ ওভারের মধ্যে বাকি আটটি উইকেট হারায় দল। একের পর এক ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফেরায় প্রতিরোধ গড়ার সম্ভাবনা মিলিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় মাত্র ৫৪ রান। অর্থাৎ প্রথম ইনিংসে পিছিয়ে থাকা ৯২ রানের ঘাটতিও পূরণ করতে পারেনি দল।
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন ওপেনার তানজিদ হাসান। আগের দিন অপরাজিত থাকা এই ব্যাটসম্যান ৪১ বল খেলে ২২ রান করেন। তাঁর পর আর কেউ দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পারেননি। মেহেদী হাসান মিরাজ ১৯ বলে করেন মাত্র ৬ রান। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন, তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন কোনো রান না করেই আউট হন। ফলে ইনিংসের শেষভাগে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয় আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ধসের মূল কারণ হয়ে ওঠেন বাঁহাতি পেসার ক্যাম্পবেল থম্পসন। তিনি একাই বাংলাদেশের ১০টি উইকেটের আটটি তুলে নেন। বাকি দুটি উইকেট পান অফ স্পিনার কোরি রকিচোলি। থম্পসনের বোলিংয়ের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের প্রতিরোধ ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। নতুন বলে তাঁর গতি ও লাইন-লেন্থ সামলাতে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডার একের পর এক ভুল করেছে।
থম্পসনের পারফরম্যান্সের কারণে ম্যাচটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। মাত্র ২২ বছর বয়সী এই বাঁহাতি পেসারের এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়নি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও তাঁর অভিজ্ঞতা সীমিত। মাত্র দুটি ম্যাচে তাঁর উইকেট ছিল তিনটি। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে দুটি ম্যাচ খেলে পেয়েছিলেন একটি উইকেট। এমন সীমিত অভিজ্ঞতার একজন বোলারের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যাটিং ইউনিটের আট উইকেট হারানো নিঃসন্দেহে দলের জন্য সতর্কবার্তা।
তবে প্রস্তুতি ম্যাচের ফলাফল দিয়ে পুরো টেস্ট সিরিজের সম্ভাব্য চিত্র নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। এ ধরনের ম্যাচের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, উইকেট ও আবহাওয়ার আচরণ বোঝা এবং সিরিজের আগে খেলোয়াড়দের প্রস্তুতির মাত্রা যাচাই করা। সে অর্থে মারারা ওভালের ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষাই হয়ে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে সফরকারী ব্যাটসম্যানদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে গতি ও বাউন্স। নতুন বল হাতে দ্রুতগতির পেসাররা ব্যাটসম্যানদের ওপর শুরু থেকেই চাপ তৈরি করতে পারেন। অফ-স্টাম্পের বাইরে সামান্য নড়াচড়া করা বল, শরীরের দিকে উঠে আসা ডেলিভারি এবং টানা কয়েক ওভার একই জায়গায় বল করার চাপ সামলাতে প্রয়োজন হয় দৃঢ় টেকনিক ও দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা।
প্রথম ইনিংসে মিরাজের সেঞ্চুরি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিক। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে, একজন বা দুজন ব্যাটসম্যানের ওপর নির্ভর করে অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে টেস্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন। টপ অর্ডারকে শুরুটা নিরাপদ করতে হবে, মিডল অর্ডারকে উইকেটে সময় দিতে হবে এবং লোয়ার অর্ডারকেও প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রতিরোধ গড়তে হবে।
বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফরের প্রথম টেস্ট শুরু হবে ১৩ আগস্ট ডারউইনে। এরপর ২২ আগস্ট ম্যাকাইয়ে শুরু হবে দ্বিতীয় টেস্ট। মূল সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ও গতিময় পেস আক্রমণের মুখোমুখি হওয়ার আগে প্রস্তুতি ম্যাচে পাওয়া এই ব্যাটিং ধস তাই গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার মতো বিষয়।
সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের দ্রুত নিজেদের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। বিশেষ করে অফ-স্টাম্পের বাইরের বল ছেড়ে দেওয়া, শরীরের কাছাকাছি উঠে আসা বল সামলানো, নতুন বলের প্রথম স্পেল পার করা এবং দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকার মানসিক প্রস্তুতির দিকে নজর দিতে হবে।
প্রস্তুতি ম্যাচে জয়-পরাজয় শেষ কথা নয়। কিন্তু কোন জায়গায় দল দুর্বল, সেটি স্পষ্ট করে দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন ম্যাচের গুরুত্ব অনেক। মারারা ওভালে বাংলাদেশ সেই দুর্বলতাগুলো খুব পরিষ্কারভাবেই দেখতে পেয়েছে। এখন টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—এই ব্যাটিং ভঙ্গুরতা কত দ্রুত কাটিয়ে উঠে দলটি নিজেদের আরও দৃঢ়ভাবে প্রস্তুত করতে পারে।