আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবি টেস্টে ব্যাট হাতে দারুণ প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশের উইকেটকিপার-ব্যাটার লিটন দাস। প্রথম ইনিংসে অর্ধশতকের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ফিফটি তুলে নিয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৯ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন একটি অর্জন যোগ করেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাট হাতে প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে পারছিলেন না লিটন। ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্নও ছিল। তবে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে দুই ইনিংসেই অর্ধশতক করে সেই চাপ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন তিনি। দলের প্রয়োজনে দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অর্জনও এসেছে তাঁর ব্যাট থেকে।
চতুর্থ দিন সকালে আগের দিনের অপরাজিত ৫ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামেন লিটন। দিনের খেলা শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজের ইনিংস এগিয়ে নেন তিনি। আগের দিন থেকে বাকি থাকা ১৩ রান পূর্ণ করে পৌঁছে যান ব্যক্তিগত অর্ধশতকের কাছাকাছি। শেষ পর্যন্ত ৭৬তম ওভারের শেষ বলে জিয়া উর রহমানের বল থেকে এক রান নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৯ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন বাংলাদেশের এই ব্যাটার।
বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৯ হাজার বা তার বেশি রান করা পঞ্চম ব্যাটার এখন লিটন। তাঁর আগে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের ক্রিকেটে ব্যাট হাতে অবদান রেখে আসা এই চার অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের তালিকায় জায়গা করে নেওয়া লিটনের ক্যারিয়ারের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন।
দুইবার জীবন পেয়েও সুযোগ কাজে লাগালেন লিটন
দ্বিতীয় ইনিংসে অর্ধশতক পূর্ণ করার পথে অবশ্য ভাগ্যের সহায়তাও পেয়েছেন লিটন। ব্যক্তিগত ১৪ ও ২৬ রানে দুইবার আউট হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। দুই ক্ষেত্রেই বোলার ছিলেন কায়েস আহমেদ। কিন্তু আফগানিস্তানের ফিল্ডাররা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি।
প্রথমবার লিটনের ব্যাট থেকে আসা ক্যাচ স্লিপে ফেলে দেন কামাল। এরপর দ্বিতীয়বার ক্যাচ ধরতে গিয়ে ব্যর্থ হন বোলার কায়েস আহমেদ নিজেই। ক্যাচ ধরার চেষ্টায় তাঁকে ব্যথায় কাতরাতেও দেখা যায়। গুরুত্বপূর্ণ দুই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় লিটন ইনিংস বড় করার সুযোগ পান।
সেই সুযোগ কাজে লাগাতে দেরি করেননি তিনি। ৬১ বলে টানা দ্বিতীয় ইনিংসে অর্ধশতক পূর্ণ করেন বাংলাদেশের এই ব্যাটার। বাউন্ডারি মারার সুযোগ পেলে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতেও পিছপা হননি। পরিস্থিতি বুঝে রান তোলার এই মিশ্র কৌশল তাঁর ইনিংসকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে।
প্রথম ইনিংসে ৫৩ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ফিফটি পাওয়ায় ম্যাচটিতে লিটনের ব্যাটিং আরও গুরুত্ব পেয়েছে। উইকেটকিপার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যাট হাতে দলের স্কোরে অবদান রাখা তাঁর ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ের অনিয়মিত পারফরম্যান্সের পর দুই ইনিংসে অর্ধশতক তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে।
তিন সংস্করণেই উল্লেখযোগ্য অবদান
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন সংস্করণেই বাংলাদেশের হয়ে উল্লেখযোগ্য রান করেছেন লিটন। টেস্টে তাঁর রান ৩ হাজার ৪০৯। এই সংস্করণে ছয়টি শতক ও ২২টি অর্ধশতক রয়েছে তাঁর নামের পাশে। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে ধৈর্য ধরে ইনিংস গড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় দ্রুত রান তোলার সামর্থ্যও দেখিয়েছেন তিনি।
ওয়ানডেতে লিটনের সংগ্রহ ২ হাজার ৮৬৯ রান। এ সংস্করণে পাঁচটি শতক ও ১৪টি অর্ধশতক করেছেন তিনি। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তাঁর ব্যাটিংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ছন্দ পেলে দ্রুত রান তোলার সক্ষমতা। তবে ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ১২৪টি ম্যাচ খেলেছেন লিটন। এ সংস্করণে তাঁর রান ২ হাজার ৭০৪, সঙ্গে রয়েছে ১৬টি অর্ধশতক। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এখনো শতকের দেখা না পেলেও দলের হয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছেন তিনি।
লিটনের তিন সংস্করণের রান ও শতক-অর্ধশতকের পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো।
| ক্রিকেটের ধরন | ম্যাচসংখ্যা | রান | শতক | অর্ধশতক |
|---|---|---|---|---|
| টেস্ট | — | ৩,৪০৯ | ৬ | ২২ |
| ওয়ানডে | — | ২,৮৬৯ | ৫ | ১৪ |
| টি-টোয়েন্টি | ১২৪ | ২,৭০৪ | ০ | ১৬ |
| মোট | — | ৮,৯৮২ | ১১ | ৫২ |
দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনে দেওয়া সংস্করণভিত্তিক রান যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ৮,৯৮২। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৯ হাজার রানের মাইলফলকের সঙ্গে এই পরিসংখ্যানে ১৮ রানের অসংগতি রয়েছে। ম্যাচসংখ্যার পূর্ণাঙ্গ তথ্যও মূল প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ
একজন ব্যাটারের সামর্থ্য কেবল একটি ভালো ইনিংস দিয়ে বিচার করা যায় না। ধারাবাহিকভাবে রান করা এবং চাপের মুহূর্তে দলের প্রয়োজনে দাঁড়ানোই তাঁর মূল্যায়নের বড় মাপকাঠি। লিটন দাসের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন খেলার অভিজ্ঞতা ও তিন সংস্করণে তাঁর অর্জন যথেষ্ট সমৃদ্ধ হলেও সাম্প্রতিক সময়ের ওঠানামা কাটিয়ে নিয়মিত পারফর্ম করা জরুরি।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবি টেস্টে পরপর দুই ইনিংসে অর্ধশতক তাঁর জন্য ইতিবাচক বার্তা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৯ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করা তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এই পারফরম্যান্সকে সামনে রেখে পরবর্তী ম্যাচগুলোতেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে তা ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশ দলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।