চোটের ধাক্কায় অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে বাংলাদেশ দলে অনিশ্চয়তা

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আসন্ন টেস্ট সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রস্তুতিতে চোটের কারণে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার এখন পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকায় নির্বাচকদের দল সাজানোর পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। বিশেষ করে পেস আক্রমণে তরুণ নাহিদ রানার অনুপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) মেডিকেল বিভাগের মূল্যায়ন অনুযায়ী, চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পুরো টেস্ট সিরিজেই তাকে পাওয়া যাবে না।

জিম্বাবুয়ে সফরের সময় বাম পাশের পেশিতে চোট পান নাহিদ রানা। পরবর্তী পরীক্ষায় তার ‘গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইন’ ধরা পড়ে। মেডিকেল বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চোট থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে তার প্রায় চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপরই অবশ্য প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফেরার সুযোগ তৈরি হবে না। মাঠে ফেরার আগে ধাপে ধাপে বোলিং শুরু করে শরীরের ওপর চাপ ও ওয়ার্কলোড বাড়াতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় আরও দুই থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। সব মিলিয়ে নাহিদের মাঠে ফিরতে ছয় থেকে আট সপ্তাহ সময় প্রয়োজন হতে পারে।

এই সময়সীমা বিবেচনায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে তার খেলার সম্ভাবনা কার্যত শেষ। নাহিদের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের পেস আক্রমণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলের বোলিং ইউনিটে নিজের জায়গা শক্ত করেছেন এই তরুণ পেসার। তার গতি, বাউন্স এবং আক্রমণাত্মক বোলিং প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের ওপর চাপ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে দ্রুতগতির পেসাররা সাধারণত বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। ফলে নাহিদকে হারিয়ে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টকে এখন নতুন করে পেস আক্রমণের ভারসাম্য ঠিক করতে হবে।

তবে উদ্বেগ শুধু নাহিদকে ঘিরে নয়। আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারের ফিটনেস পরিস্থিতি অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দল নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।

বাঁ-হাতি পেসার শরিফুল ইসলাম গ্রেড-১ বাম হ্যামস্ট্রিং চোট থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। তার পুনর্বাসন এখন পর্যন্ত সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৯ জুলাই থেকে তার বোলিং শুরু করার কথা রয়েছে। এরপর ১২ আগস্ট তার ফিটনেস পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পুনর্বাসনের ধাপগুলো সফলভাবে শেষ করে বোলিংয়ের ওয়ার্কলোড সামলাতে পারলে দ্বিতীয় টেস্টে তাকে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রথম টেস্টে তার খেলার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম।

বাংলাদেশের ব্যাটিং ও উইকেটকিপিং বিভাগেও রয়েছে অনিশ্চয়তা। উইকেটরক্ষক-ব্যাটার লিটন কুমার দাস বাম পায়ের কাফ মাসলের চোট থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে তিনি সিঙ্গাপুরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন এবং প্লেটলেট-রিচ প্লাজমা থেরাপিও নিয়েছেন। পুনর্বাসন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৮ জুলাই থেকে তার ধাপে ধাপে রানিং ও ফিটনেস কন্ডিশনিং শুরু করার কথা। ১৩ আগস্ট তার ফিটনেস পরীক্ষা হতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে দ্বিতীয় টেস্ট থেকে তাকে নির্বাচকদের বিবেচনায় পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার ফেরার বিষয়টি নির্ভর করবে পুনর্বাসনের অগ্রগতি ও ফিটনেস পরীক্ষার ফলের ওপর।

ডানহাতি পেসার তানজিম হাসান সাকিবের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও দীর্ঘমেয়াদি। তিনি এখনো পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন। সাম্প্রতিক স্ক্যান ও বিদেশি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী, তাকে আরও কিছু সময় পুনর্বাসনে থাকতে হবে। প্রায় আট থেকে দশ সপ্তাহ পর তার পুনরায় স্ক্যান করার কথা রয়েছে। হাড়ের ক্ষত কত দ্রুত সেরে ওঠে, তার ওপরই নির্ভর করবে মাঠে ফেরার সময়। বর্তমান পরিস্থিতিতে চলতি বছরের শেষ দিকে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফেরার সম্ভাবনাই বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত অনিশ্চিত।

অভিজ্ঞ বাঁ-হাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানও চোট কাটিয়ে ফেরার লড়াইয়ে রয়েছেন। ডান পায়ের হ্যামস্ট্রিং ও কাফ মাসলের চোটের কারণে তিনি নিয়মিত পুনর্বাসন চালিয়ে যাচ্ছেন। চলতি মাসের শেষ দিকে তার ফিটনেস মূল্যায়ন হওয়ার কথা। এরপর পরিস্থিতি সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে বোলিংয়ের ওয়ার্কলোড বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক এগোলে ১৮ আগস্টের পর জাতীয় দলের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তার। সে ক্ষেত্রে সিরিজের পরবর্তী অংশে মুস্তাফিজকে পাওয়া বাংলাদেশের পেস আক্রমণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ক্রিকেটার চোট বা সমস্যা বর্তমান অবস্থা সম্ভাব্য পরবর্তী ধাপ অস্ট্রেলিয়া সিরিজে সম্ভাবনা
নাহিদ রানা গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইন পুনর্বাসনে ছয় থেকে আট সপ্তাহের পুনরুদ্ধার পুরো সিরিজে বাইরে
শরিফুল ইসলাম গ্রেড-১ বাম হ্যামস্ট্রিং পুনর্বাসন সন্তোষজনক ২৯ জুলাই থেকে বোলিং দ্বিতীয় টেস্টে সম্ভাবনা
শরিফুল ইসলাম হ্যামস্ট্রিং পুনর্বাসন ফিটনেস পর্যবেক্ষণে ১২ আগস্ট ফিটনেস পরীক্ষা প্রথম টেস্টে অনিশ্চিত
লিটন কুমার দাস বাম কাফ মাসলের চোট ধীরে ধীরে সুস্থ ২৮ জুলাই থেকে রানিং ও কন্ডিশনিং দ্বিতীয় টেস্টে সম্ভাবনা
লিটন কুমার দাস কাফ মাসল পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে চিকিৎসা ১৩ আগস্ট ফিটনেস পরীক্ষা ফিটনেসের ওপর নির্ভরশীল
তানজিম হাসান সাকিব হাড়ের ক্ষত পুনর্বাসনে আট থেকে দশ সপ্তাহ পর স্ক্যান অস্ট্রেলিয়া সিরিজে অনিশ্চিত
তানজিম হাসান সাকিব চলমান পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে পরবর্তী স্ক্যানের পর মূল্যায়ন দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা
মুস্তাফিজুর রহমান ডান হ্যামস্ট্রিং ও কাফ মাসল পুনর্বাসনে ফিটনেস মূল্যায়ন ও বোলিং ওয়ার্কলোড আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে সম্ভাবনা
নাহিদ রানা বাম পাশের পেশির চোট প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের বাইরে ধাপে ধাপে বোলিংয়ে ফেরা সিরিজে নেই
মুস্তাফিজুর রহমান পায়ের পেশির চোট নিয়মিত পুনর্বাসন ওয়ার্কলোড সফলভাবে সম্পন্ন করা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতির সম্ভাবনা

বর্তমান পরিস্থিতিতে নাহিদ রানাকে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে পাওয়ার কোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই। শরিফুল ইসলাম ও লিটন কুমার দাসের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় টেস্টকে লক্ষ্য করে এগোনোর সুযোগ রয়েছে। তবে দুজনেরই প্রত্যাবর্তন নির্ভর করবে পুনর্বাসন, ফিটনেস পরীক্ষা এবং ক্রিকেটীয় কার্যক্রমে ফেরার সক্ষমতার ওপর। তানজিম হাসান সাকিবের ফেরার সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে। অন্যদিকে মুস্তাফিজুর রহমানকে আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে জাতীয় দলের জন্য প্রস্তুত পাওয়ার বিষয়ে কিছুটা আশাবাদ রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের আগে চোটের এই তালিকা বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে নাহিদের অনুপস্থিতি পেস আক্রমণের পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। শরিফুল ও মুস্তাফিজের ফিটনেসও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে লিটনকে না পাওয়া গেলে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি উইকেটকিপিং বিভাগেও নতুন সমন্বয় করতে হতে পারে।

এখন বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টকে একই সঙ্গে দুটি বিষয় সামলাতে হবে। একদিকে চোটগ্রস্ত ক্রিকেটারদের নিরাপদ ও কার্যকর পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে সম্ভাব্য বিকল্পদেরও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কঠিন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে। কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করতে শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ দল, পর্যাপ্ত পেস বিকল্প এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত পরিকল্পনা বদলে নেওয়ার সক্ষমতা।

সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্বস্তি হবে চোটগ্রস্ত ক্রিকেটারদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন। আর যারা ফিরতে পারবেন না, তাদের ঘাটতি পূরণ করে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলাই এখন টিম ম্যানেজমেন্টের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্য করুন