জিম্বাবুয়ে সফরে বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যর্থতার পেছনে ব্যাটিং দুর্বলতাকেই অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল। তাঁর মতে, স্বাগতিক দলের পেসারদের বাড়তি বাউন্স, ভিন্ন ধরনের উইকেট এবং অপরিচিত কন্ডিশনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে না পারায় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স করতে পারেননি। তবে এই সফরের ভুলগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তা থেকে শিক্ষা নিতে পারলে জিম্বাবুয়ে সফরই সামনে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সম্প্রতি জিম্বাবুয়ে সফর শেষ করে দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। পূর্ণাঙ্গ এই সফরে তিন সংস্করণের ক্রিকেটেই মুখোমুখি হয় দুই দল। সফরের শুরুতেই একমাত্র টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে পরাজয় বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। এরপর ওয়ানডে সিরিজেও প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি সফরকারীরা। ফলে টেস্ট ও ওয়ানডে—দুই সংস্করণেই বাংলাদেশের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
টি-টোয়েন্টি সিরিজে অবশ্য শেষ দিকে কিছুটা স্বস্তি ফেরে। সিরিজের শেষ ম্যাচে নাটকীয় লড়াইয়ের পর চার উইকেটে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। সেই জয় দলকে একই সফরে তিন সংস্করণেই পরাজয়ের বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করে। তবে টি-টোয়েন্টিতে জয় দিয়ে সফর শেষ হলেও তিন সংস্করণ মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং পারফরম্যান্স ছিল উদ্বেগজনক। পুরো সফরে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানই সেঞ্চুরি করতে পারেননি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোর প্রবণতাও দলকে চাপে ফেলেছে।
আশরাফুলের মতে, জিম্বাবুয়ের কন্ডিশনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল বাড়তি বাউন্স সামলানো। দেশের তুলনামূলক ধীরগতির ও কম বাউন্সের উইকেটের সঙ্গে অভ্যস্ত ব্যাটসম্যানদের জন্য জিম্বাবুয়ের পিচে বলের উচ্চতা ও গতি ছিল ভিন্ন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে শরীরের কাছাকাছি আসা বল, অফ স্টাম্পের বাইরে ওঠা ডেলিভারি এবং পেসারদের পরিবর্তিত লেংথের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু ভুল হয়েছে।
দেশে ফেরার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আশরাফুল বলেন, টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা কন্ডিশনের সঙ্গে যথেষ্ট দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেননি। তবে সফর যত এগিয়েছে, ততই কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে। বিশেষ করে ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে এসে ব্যাটসম্যানরা তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিলেন বলে মনে করেন তিনি।
এই পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের বিদেশের মাটিতে পারফরম্যান্সের দীর্ঘদিনের একটি চ্যালেঞ্জকেও সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের কন্ডিশনে সাফল্য পাওয়ার পর বিদেশে গিয়ে একই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সহজ নয়। উইকেটের গতি ও বাউন্সের পার্থক্য, আবহাওয়া, বলের আচরণ এবং প্রতিপক্ষের বোলিং পরিকল্পনা—সবকিছুই একসঙ্গে বদলে যায়। ফলে শুধু টেকনিক্যাল দক্ষতা থাকলেই হয় না; পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের ধরন বদলানোর সক্ষমতাও প্রয়োজন।
জিম্বাবুয়ে সফরের আগে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ থাকলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ হতে পারত বলে মনে করেন আশরাফুল। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ঘনবসতিপূর্ণ সূচি এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বিস্তারের কারণে বিদেশ সফরে যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুযোগ এখন অনেক কমে গেছে।
একসময় বিদেশ সফরের আগে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ কিংবা একটি ওয়ানডে ম্যাচ খেলার সুযোগ থাকত। এতে সফরকারী দলের খেলোয়াড়েরা স্থানীয় উইকেটের আচরণ বুঝে নেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের কৌশলও পরীক্ষা করতে পারতেন। বিশেষ করে ব্যাটসম্যানেরা পিচের গতি, বাউন্স এবং বলের ওঠানামা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতেন। এখন অনেক সময় মূল সিরিজ শুরুর আগেই সরাসরি আন্তর্জাতিক ম্যাচে নামতে হয়। ফলে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চাপ আরও বেড়ে যায়।
জিম্বাবুয়ে সফরে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা ছিল—
- বাড়তি বাউন্সের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে না পারা।
- শরীরের কাছাকাছি আসা বলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হওয়া।
- পেসারদের বিপক্ষে ধৈর্য ধরে ইনিংস বড় করতে না পারা।
- ভিন্ন উইকেট ও কন্ডিশনে ব্যাটিংয়ের পরিকল্পনা দ্রুত বদলাতে না পারা।
- তিন সংস্করণে খেলার ধরন বদলালেও ব্যাটিংয়ের মৌলিক সমস্যাগুলো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে না পারা।
- পুরো সফরে কোনো ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরি না পাওয়া।
- গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট হারিয়ে প্রতিপক্ষকে ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
আশরাফুল মনে করেন, এই সমস্যাগুলোকে কেবল একটি সফরের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে চলবে না। সামনে ২০২৭ সালের বিশ্বকাপসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে। বড় টুর্নামেন্টে ভালো করতে হলে নিজেদের পরিচিত পরিবেশে রান করার পাশাপাশি বিদেশের মাটিতেও দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তাই জিম্বাবুয়ে সফরে প্রকাশ পাওয়া দুর্বলতাগুলো এখনই চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কাজ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামনে এখন আরও কঠিন পরীক্ষা। আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে যাবে দলটি। দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামার আগে এই সিরিজের গুরুত্বও কম নয়। অস্ট্রেলিয়ার উইকেটে সাধারণত গতি ও বাউন্স বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সেখানে মানসম্পন্ন পেস আক্রমণের বিপক্ষে নতুন বলে টিকে থাকা এবং পরবর্তী সময়ে ইনিংসকে বড় করার জন্য প্রয়োজন হবে শক্তিশালী টেকনিক, ধৈর্য ও পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
জিম্বাবুয়ের কন্ডিশন ও অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ এক নয়। দুই দেশের উইকেট, আবহাওয়া এবং বোলিং আক্রমণের ধরনেও পার্থক্য রয়েছে। তারপরও জিম্বাবুয়ে সফরে বাড়তি বাউন্সের বিপক্ষে যে সমস্যাগুলো দেখা গেছে, সেগুলো অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে পেস বোলিং মোকাবিলায় ব্যাটসম্যানদের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা এবং ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী শট নির্বাচনে উন্নতি করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
আশরাফুলের বিশ্বাস, গত কয়েক মাস দেশের মাটিতে ভালো ক্রিকেট খেলার পর ভিন্ন পরিবেশে গিয়ে বাংলাদেশের মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগেছে। এই অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচকভাবে দেখার বদলে ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কাজে লাগানো উচিত। জিম্বাবুয়ে সফরের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করে যদি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে সেই অভিজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়া সিরিজে বাংলাদেশের জন্য উপকার বয়ে আনতে পারে।
সব মিলিয়ে জিম্বাবুয়ে সফর বাংলাদেশের ব্যাটিং ইউনিটের জন্য যেমন হতাশার, তেমনি আত্মবিশ্লেষণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বাড়তি বাউন্স ও গতির বল মোকাবিলা, পেসারদের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করা, অপরিচিত কন্ডিশনে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া এবং চাপের মুহূর্তে উইকেট ধরে রাখার দক্ষতা—এসব জায়গায় উন্নতি ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সাফল্য পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই জিম্বাবুয়ের ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নয়, বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোনোর ওপরই এখন বাংলাদেশের সাফল্যের অনেকটাই নির্ভর করছে।