অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। ডারউইনে স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারানোর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সর্বশেষ টেস্ট র্যাঙ্কিংয়েও তার প্রতিফলন দেখা গেছে। ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই বাংলাদেশের একাধিক ক্রিকেটার উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছেন। সবচেয়ে বড় অগ্রগতি এসেছে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, পেসার হাসান মাহমুদ এবং তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিমের ক্ষেত্রে।
ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের জয়ের অন্যতম প্রধান নায়ক ছিলেন হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে অস্ট্রেলিয়াকে গুটিয়ে দিতে তার ছয় উইকেটের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় ইনিংসেও তিনটি উইকেট নিয়ে তিনি স্বাগতিক ব্যাটিং লাইনআপে চাপ ধরে রাখেন। ম্যাচে মোট নয় উইকেট নেওয়া এই পেসার শেষ পর্যন্ত ম্যাচসেরার স্বীকৃতিও পান। এমন পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে বোলিং র্যাঙ্কিংয়ে তিনি এক লাফে ২৬ ধাপ এগিয়ে ৩৮তম স্থানে উঠে এসেছেন।
বাংলাদেশের জয়ের ভিত অবশ্য তৈরি হয়েছিল ব্যাটারদের দৃঢ়তায়। অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে তোলে ৪২৬ রান। এতে লিড দাঁড়ায় ২২৮ রানের। তানজিদ হাসানের শতক, শান্তর ৮৪ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের ইনিংস বাংলাদেশের স্কোরকে বড় করতে বড় ভূমিকা রাখে।
অধিনায়ক শান্তর জন্যও ম্যাচটি ছিল বিশেষ। প্রথম ইনিংসে ৮৪ রানের পরিণত ইনিংস খেলে তিনি ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়ে নয় ধাপ এগিয়ে ক্যারিয়ারের সেরা ২০তম অবস্থানে উঠেছেন। তার রেটিং পয়েন্ট এখন ৬৫৯। প্রথমবারের মতো শীর্ষ ২০ ব্যাটারের তালিকায় জায়গা করে নেওয়া শান্তর টেস্ট ক্যারিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ অগ্রগতি তানজিদ হাসানের। মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমে তিনি ১৯৭ বল মোকাবিলা করে ১০১ রানের ধৈর্যশীল ইনিংস খেলেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্টে শতক করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হওয়ার পাশাপাশি র্যাঙ্কিংয়েও তার অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ৮৪ ধাপ এগিয়ে তিনি যৌথভাবে ৮৮তম স্থানে উঠেছেন। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এত বড় ইনিংস তার আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্যারিয়ারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে।
মেহেদী হাসান মিরাজের অবদানও কম নয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৬ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রতিরোধ ভেঙে দেন। স্বাগতিক দল ২৮৪ রানে অলআউট হলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। বোলিং র্যাঙ্কিংয়ে তিন ধাপ উন্নতি করে মিরাজ এখন ২৪তম স্থানে। ব্যাটিংয়েও তিনি পাঁচ ধাপ এগিয়ে ৫৯তম অবস্থানে উঠে এসেছেন। তবে অলরাউন্ডারদের র্যাঙ্কিংয়ে তার অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের র্যাঙ্কিং অবস্থান
| ক্রিকেটার | বিভাগ | নতুন অবস্থান | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| নাজমুল হোসেন শান্ত | ব্যাটিং | ২০তম | ৯ ধাপ উন্নতি |
| মুশফিকুর রহিম | ব্যাটিং | ১৮তম | অপরিবর্তিত |
| লিটন দাস | ব্যাটিং | ২৮তম | ৫ ধাপ অবনতি |
| মুমিনুল হক | ব্যাটিং | ৩১তম | ৫ ধাপ উন্নতি |
| সাদমান ইসলাম | ব্যাটিং | ৫৮তম | ৩ ধাপ উন্নতি |
| মেহেদী হাসান মিরাজ | ব্যাটিং | ৫৯তম | ৫ ধাপ উন্নতি |
| তানজিদ হাসান | ব্যাটিং | যৌথ ৮৮তম | ৮৪ ধাপ উন্নতি |
| হাসান মাহমুদ | বোলিং | ৩৮তম | ২৬ ধাপ উন্নতি |
| মেহেদী হাসান মিরাজ | বোলিং | ২৪তম | ৩ ধাপ উন্নতি |
| তাইজুল ইসলাম | বোলিং | ১১তম | অপরিবর্তিত |
| তাসকিন আহমেদ | বোলিং | ৪৯তম | ১ ধাপ উন্নতি |
বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন মুশফিকুর রহিম। তিনি ১৮তম অবস্থান ধরে রেখেছেন। শান্তর উত্থানে বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যাটারদের তালিকায় প্রতিযোগিতাও আরও শক্ত হয়েছে। লিটন দাস পাঁচ ধাপ পিছিয়ে ২৮তম হলেও মুমিনুল হক পাঁচ ধাপ উঠে ৩১তম হয়েছেন। সাদমান ইসলামও তিন ধাপ উন্নতি করে ৫৮তম স্থানে পৌঁছেছেন।
বোলিং বিভাগে তাইজুল ইসলাম ১১তম অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাসকিন আহমেদ এক ধাপ এগিয়ে ৪৯তম হয়েছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে একাধিক ক্রিকেটারের উন্নতি দলটির সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
ডারউইন টেস্টের প্রভাব শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের র্যাঙ্কিংয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটার ট্র্যাভিস হেড দুই ইনিংসে ২২ ও ১৭ রান করে টেস্ট ব্যাটিংয়ের শীর্ষস্থান হারিয়েছেন। তাকে পেছনে ফেলে আবার এক নম্বরে উঠেছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি ব্রুক। জো রুট দ্বিতীয় এবং স্টিভ স্মিথ তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। ডারউইনে স্মিথের ব্যাট থেকে এসেছিল ৭১ ও ৪৪ রান। একই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ক্যামেরন গ্রিন দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৪ রানের শতক করে পাঁচ ধাপ এগিয়ে ৩০তম স্থানে উঠেছেন।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই র্যাঙ্কিং উন্নতি এসেছে দলীয় সাফল্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশ দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটিই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট শতাংশও ৬৬ দশমিক ৬৭ নিয়ে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে।
ডারউইনের জয় তাই কেবল একটি ম্যাচের ফল নয়। শান্তর নেতৃত্ব, তানজিদের আত্মবিশ্বাসী শতক, হাসান মাহমুদের গতিময় বোলিং, মিরাজের কার্যকর স্পিন এবং দলের সম্মিলিত পারফরম্যান্স বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। র্যাঙ্কিংয়ে একসঙ্গে এত কয়েকজন ক্রিকেটারের উন্নতি সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। একটি ঐতিহাসিক জয়কে সিরিজ জয়ে রূপ দিতে হলে দ্বিতীয় টেস্টেও ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই একই রকম শৃঙ্খলা দেখাতে হবে। ডারউইনে যে আত্মবিশ্বাসের সূচনা হয়েছে, সেটি ধরে রাখতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের স্বপ্নও বাস্তব সম্ভাবনায় পরিণত হতে পারে।