ডি থ্রি ট্রফি: ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন দিনের সূচনা, কোচ ও সাপোর্ট স্টাফ নির্বাচনে বিসিবির ঐতিহাসিক ড্রাফট

বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের চিরচেনা রূপ বদলে দিতে এক ব্যতিক্রমী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। প্রথমবারের মতো কেবল ক্রিকেটারই নয়, দল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কোচ এবং সাপোর্ট স্টাফ বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও প্রবর্তন করা হয়েছে ড্রাফট পদ্ধতি। মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘ম্যানেজমেন্ট ড্রাফট’-এর মাধ্যমে বিসিবির নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক উদ্যোগ ‘ডি থ্রি ট্রফি’র ছয়টি দল তাদের কোচিং ও অফ-ফিল্ড পরিচালনা পর্ষদ চূড়ান্ত করেছে।

বিসিবির এই সমন্বিত টুর্নামেন্ট কাঠামোর সবচেয়ে লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো—একই ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি, ৫০ ওভার এবং চার দিনের ক্রিকেট—তিনটি ভিন্ন সংস্করণের প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। পৃথক টুর্নামেন্টে ভিন্ন ভিন্ন দল গঠনের বদলে একই কাঠামোর অধীনে তিন সংস্করণের খেলা আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি সুসংহত করা এবং টেকসই ক্রিকেটীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলা। প্রতিটি দল ২৩ জন ক্রিকেটার নিয়ে গঠিত হবে এবং এর সমান্তরালে একজন প্রধান কোচ, দুজন সহকারী কোচ, একজন ফিজিও, একজন ট্রেনার এবং একজন পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট নিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সাপোর্ট স্টাফ টিম সাজানো হয়েছে।

ড্রাফটে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দেশের অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত কোচদের ওপর আস্থা রেখেছে। ওয়ালটনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে সাবেক জাতীয় স্পিনার আব্দুর রাজ্জাকের হাতে। দেশের অন্যতম শীর্ষ কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে বেছে নিয়েছে ফরচুন গ্রুপ। অন্যদিকে সিটিজেনস ব্যাংক মিজানুর রহমান বাবুলকে, এইস ব্লু স্টার সোহেল ইসলামকে, একমি রাজিন সালেহকে এবং সেভেন রিংস সিমেন্ট সাবেক পেসার তালহা জুবায়েরকে তাদের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।

এই ড্রাফটের অন্যতম আকর্ষণের জায়গা ছিল জাতীয় দল ও বয়সভিত্তিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা কোচিং স্টাফদের ঘরোয়া ক্রিকেটে সরাসরি সম্পৃক্ততা। জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলকে ফরচুন গ্রুপের সহকারী কোচ করা হয়েছে, যেখানে প্রধান কোচের ভূমিকা পালন করছেন বিসিবির হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিটের প্রধান সালাউদ্দিন। সেভেন রিংস সিমেন্টের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া তালহা জুবায়েরের পাশাপাশি সহকারী কোচ করা হয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রধান কোচ হান্নান সরকার ও অভিজ্ঞ হুমায়ুন কবির শাহীনকে।

জাতীয় দলের কোচদের ঘরোয়া লিগে যুক্ত করা নিয়ে ক্রিকেটপাড়ায় কিছুটা সংশয় তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট বা সিরিজের সূচির সাথে যদি ডি থ্রি ট্রফির খেলাগুলো মুখোমুখি হয়, তবে জাতীয় দলের কোচরা কীভাবে ক্লাব সামলাবেন—এই প্রশ্নের উত্তরে বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটির প্রধান সিরাজউদ্দীন মোহাম্মদ আলমগীর জানিয়েছেন, জাতীয় দলের কোনো নির্ধারিত ব্যস্ততা না থাকলেই কেবল তারা ঘরোয়া টুর্নামেন্টে দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যথায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প কোচদের প্রস্তুত রাখা হবে।

কোচিং স্টাফের পাশাপাশি দলগুলোর আইকন খেলোয়াড়দের নামও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন দেশসেরা তারকারা—

ডি থ্রি ট্রফির ছয় দলের আইকন ক্রিকেটার ও প্রধান কোচ:

  • ওয়ালটন: আইকন — মেহেদী হাসান মিরাজ | প্রধান কোচ — আব্দুর রাজ্জাক

  • ফরচুন গ্রুপ: আইকন — তাওহীদ হৃদয় | প্রধান কোচ — মোহাম্মদ সালাউদ্দিন

  • এইস ব্লু স্টার: আইকন — নুরুল হাসান সোহান | প্রধান কোচ — সোহেল ইসলাম

  • সিটিজেনস ব্যাংক: আইকন — নাঈম শেখ | প্রধান কোচ — মিজানুর রহমান বাবুল

  • একমি: আইকন — মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত | প্রধান কোচ — রাজিন সালেহ

  • সেভেন রিংস সিমেন্ট: আইকন — মুশফিকুর রহিম | প্রধান কোচ — তালহা জুবায়ের

মাঠের লড়াই শুরুর প্রাক্কালে বিসিবি একটি সুনির্দিষ্ট সূচি নির্ধারণ করেছে। আগামী ১৫ ডিসেম্বর সংক্ষিপ্ত সংস্করণের টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট দিয়ে ডি থ্রি ট্রফির পর্দা উঠবে। পরবর্তী ধাপে জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে চার দিনের দীর্ঘ ফরম্যাটের ক্রিকেট এবং সবশেষে মে মাসে মাঠে গড়াবে ৫০ ওভারের ওয়ানডে টুর্নামেন্ট। তিন সংস্করণ মিলিয়ে সর্বমোট ৪২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে; যার মধ্যে রয়েছে ১৯টি টি-টোয়েন্টি, ১৬টি ওয়ানডে এবং ৭টি চার দিনের ম্যাচ।

একই স্কোয়াড এবং কোচিং প্যানেল দিয়ে তিন ফরম্যাটের খেলায় ভারসাম্য বজায় রাখা দলগুলোর জন্য বড় একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আক্রমণাত্মক কৌশলের পাশাপাশি চার দিনের খেলায় টেকনিক, মানসিক দৃঢ়তা ও টানা বোলিংয়ের ধৈর্য পরীক্ষা দিতে হবে খেলোয়াড়দের। একইভাবে ৫০ ওভারের ম্যাচে প্রথম দুই কাঠামোর সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে।

ম্যানেজমেন্ট ড্রাফটের এই সফল সমাপ্তির পর এখন সবার দৃষ্টি ২৬ অক্টোবরের খেলোয়াড় নিলামের দিকে। খেলোয়াড় ড্রাফট সম্পন্ন হলেই প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজির পূর্ণাঙ্গ স্কোয়াড এবং দলগত শক্তিমত্তার আসল ছবি পরিষ্কার হয়ে উঠবে। বিসিবির এই যুগান্তকারী পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবে সুফল বয়ে আনে, তা দেখার জন্য এখন অপেক্ষা কেবল ১৫ ডিসেম্বরের ক্রিকেট যুদ্ধের।

মন্তব্য করুন