টেস্ট ক্রিকেট আর টি-টোয়েন্টি—দুটি ফরম্যাটের ব্যাটিংয়ের চাহিদা যেন দুই মেরুর। টেস্টে একজন ব্যাটসম্যানকে দীর্ঘ সময় ক্রিজে থেকে ধৈর্য ও মনোযোগের পরীক্ষা দিতে হয়। পরিস্থিতি বুঝে শট নির্বাচন, বোলারের পরিকল্পনা পড়া এবং উইকেটের চরিত্র অনুযায়ী ব্যাটিং বদলে নেওয়া সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। টি-টোয়েন্টিতে আবার সময়ের সঙ্গে লড়াই। মাত্র ১২০ বলের ইনিংসে দ্রুত রান তুলতে হয়, নিতে হয় ঝুঁকি, আর কখনো কখনো কয়েক বলেই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে হয়।
এই দুই ভিন্নধর্মী ক্রিকেটে একই সঙ্গে সাফল্য দেখাচ্ছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি ব্রুক। টেস্ট ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়ে ৮৬১ পয়েন্ট নিয়ে তিনি এখন এক নম্বরে। টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং র্যাঙ্কিংয়েও তাঁর জায়গা শীর্ষ দশে—নবম। অর্থাৎ লাল বল ও টি-টোয়েন্টির ক্রিকেটে একই সময়ে বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় রয়েছেন এই ইংলিশ তারকা।
বর্তমান র্যাঙ্কিংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ব্রুকই একমাত্র ক্রিকেটার যিনি একই সঙ্গে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের শীর্ষ দশে অবস্থান করছেন। দুই ফরম্যাটের মধ্যে ক্রমেই বাড়তে থাকা বিশেষায়নের সময়ে এই অর্জন তাঁর ক্রিকেটীয় সক্ষমতার একটি আলাদা ছবি তুলে ধরে।
ব্রুকের সাম্প্রতিক সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নেতৃত্বও। ইংল্যান্ডের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর নেতৃত্বে দল ২৬টি ম্যাচ খেলেছে, যার ২৩টিতেই জিতেছে। সর্বশেষ সাফল্য এসেছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে।
সিরিজে ব্রুক ছিলেন ইংল্যান্ডের অন্যতম প্রধান পারফর্মার। একটি সেঞ্চুরিসহ তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ১৭০ রান। ব্যাট হাতে এমন ধারাবাহিকতার কারণে সিরিজসেরার স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। একই সিরিজের ফল ইংল্যান্ডের দলীয় র্যাঙ্কিংয়েও প্রভাব ফেলেছে। শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠে এসেছে ইংল্যান্ড, পেছনে ফেলেছে ভারতকে।
ব্রুকের সাফল্য বোঝার জন্য তাঁর দুই ফরম্যাটের পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি। টেস্টে একজন ব্যাটসম্যানকে নতুন বলের চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়। বোলারের সুইং, পেস, বাউন্স কিংবা পুরোনো বলের ভিন্ন আচরণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। একটি বড় ইনিংস গড়তে সময় লাগে, আর সেই সময়টুকু কাজে লাগাতে মানসিক স্থিরতা অপরিহার্য।
টি-টোয়েন্টিতে সেই সময় নেই। কয়েকটি ডট বলই চাপ তৈরি করতে পারে। ফিল্ডিংয়ের ফাঁক খুঁজে দ্রুত সিঙ্গেল নেওয়া থেকে শুরু করে বাউন্ডারি বের করার সিদ্ধান্ত—সবকিছুই করতে হয় অল্প সময়ের মধ্যে। কোন বোলারকে আক্রমণ করা হবে, কখন ঝুঁকি নেওয়া হবে, কখন স্ট্রাইক বদলানো দরকার—এসব সিদ্ধান্তও নিতে হয় দ্রুত।
একজন ব্যাটসম্যানের পক্ষে এই দুই ধরনের মানসিকতা পাশাপাশি ধরে রাখা তাই সহজ নয়। তার সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ঘন সূচি এবং বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতা। খেলোয়াড়দের অনেক সময় নির্দিষ্ট ফরম্যাটকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। কেউ টেস্ট ক্রিকেটে মনোযোগ ধরে রাখতে টি-টোয়েন্টি কমিয়ে দেন, আবার কেউ সাদা বলের ক্রিকেটে দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ার জন্য লাল বলের ক্রিকেট থেকে দূরে থাকেন।
টেস্ট ও টি-টোয়েন্টির র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানীয় ব্যাটসম্যানদের তালিকাতেও সেই বিভাজন দেখা যায়। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে ব্রুকের পর রয়েছেন স্টিভ স্মিথ, জো রুট, ট্রাভিস হেড ও টেম্বা বাভুমা। তাঁদের মধ্যে হেড ছাড়া অন্যরা বর্তমানে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত নন বা ওই ফরম্যাটে জাতীয় দলের বিবেচনায় নেই। অন্যদিকে টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ পাঁচে থাকা ঈশান কিষান, অভিষেক শর্মা, সাহিবজাদা ফারহান, ফিল সল্ট ও ডেভাল্ড ব্রেভিস টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত খেলছেন না।
এই জায়গাতেই ব্রুকের অবস্থান আলাদা হয়ে ওঠে। তিনি দুই ফরম্যাটে খেলছেন, আবার দুই ফরম্যাটেই র্যাঙ্কিংয়ের ওপরের দিকে অবস্থান করছেন।
নিজের এই ধারাবাহিকতার পেছনে তাঁর ক্রিকেটীয় অগ্রাধিকারের কথাও জানিয়েছেন ব্রুক। শ্রীলঙ্কা সিরিজ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ইংল্যান্ডের এই অধিনায়ক বলেন, যতটা সম্ভব ইংল্যান্ডের হয়ে খেলাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। ফিট থেকে জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত খেলতে চান তিনি। দ্য হানড্রেড ছাড়া অন্য কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে না খেলার সিদ্ধান্তও সেই পরিকল্পনার অংশ।
জাতীয় দলের ক্রিকেটকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত তাঁকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়া আর সেই সুযোগকে সাফল্যে পরিণত করা এক বিষয় নয়। র্যাঙ্কিংয়ে ওপরে থাকতে হলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দরকার। ব্রুকের ক্ষেত্রে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
টেস্টে তাঁর ব্যাটিং তাঁকে বিশ্বের এক নম্বর অবস্থানে নিয়ে এসেছে। টি-টোয়েন্টিতেও তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং কার্যকারিতা তাঁকে শীর্ষ দশে রেখেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অধিনায়কত্বের চাপ। দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নিজের ব্যাটিংয়েও ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সহজ কাজ নয়।
আধুনিক ক্রিকেটে ফরম্যাটভিত্তিক বিশেষায়ন এখন আরও স্পষ্ট। টেস্টের জন্য আলাদা প্রস্তুতি, টি-টোয়েন্টির জন্য আলাদা কৌশল এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ভিন্ন চাহিদা—সব মিলিয়ে একজন ক্রিকেটারের সময় ও শক্তির ওপর চাপ বাড়ছে। এই বাস্তবতায় দুই ফরম্যাটে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর থাকা বড় চ্যালেঞ্জ।
হ্যারি ব্রুক সেই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। তাঁর সাফল্যের গল্প কেবল দুটি র্যাঙ্কিংয়ের অবস্থান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় দলের হয়ে খেলার অগ্রাধিকার, নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্যাটিং মানিয়ে নেওয়া এবং অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব সামলানোর সক্ষমতা।
টেস্টে ৮৬১ পয়েন্ট নিয়ে এক নম্বর, টি-টোয়েন্টিতে নবম—দুটি অবস্থানই দেখাচ্ছে, ব্রুক নিজেকে কোনো একটি ফরম্যাটের মধ্যে আটকে রাখেননি। লাল বলের দীর্ঘ লড়াই হোক কিংবা টি-টোয়েন্টির দ্রুত উত্তেজনা, দুই ক্ষেত্রেই তিনি ইংল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার হিসেবে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছেন।