বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের ক্রিকেট মাঠ ও পিচ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ স্থানীয় জনবল গড়ে তুলতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এরই অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো দেশের পিচ কিউরেটর ও মাঠকর্মীদের জন্য লেভেল-১ প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। ক্রিকেট অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন এবং মাঠ ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে বিসিবি।
আগামী ১১ ও ১২ আগস্ট চট্টগ্রামের ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে দুই দিনের এই প্রশিক্ষণ কর্মশালা। বিসিবির হেড অব টার্ফ ম্যানেজমেন্ট টনি হেমিংয়ের নেতৃত্বে কোর্সটি পরিচালিত হবে। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের পিচ ও টার্ফ ব্যবস্থাপনার মৌলিক বিষয়, উইকেট প্রস্তুতির কৌশল এবং মাঠের গুণগত মান ধরে রাখার প্রয়োজনীয় পদ্ধতি সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও বাস্তবভিত্তিক ধারণা দেওয়া হবে।
বিসিবির গ্রাউন্ডস কমিটির সদস্য সচিব মাজহার উদ্দিন জানিয়েছেন, দেশের কিউরেটর ও মাঠকর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রথমবারের মতো লেভেল-১ সনদ কোর্স চালু করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ কিউরেটর তৈরির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন ক্রিকেট ভেন্যুতে মাঠ ব্যবস্থাপনার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।
প্রথম ধাপের এই কর্মশালায় ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভেন্যুতে দায়িত্ব পালন করা মোট ৩০ জন কিউরেটর অংশ নেবেন। দুই দিনের প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা নেওয়া হবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণরাই লেভেল-১ সনদ অর্জনের যোগ্যতা পাবেন। অর্থাৎ, শুধু কর্মশালায় অংশগ্রহণ করলেই সনদ পাওয়া যাবে না; প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার মূল্যায়নের পরই সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ক্রিকেটে একটি ম্যাচের মান অনেকটাই নির্ভর করে মাঠ ও উইকেটের প্রস্তুতির ওপর। পিচের চরিত্র অনুযায়ী ব্যাটিং ও বোলিংয়ের ভারসাম্য, ঘাসের ঘনত্ব, মাটির গঠন, আর্দ্রতা এবং আবহাওয়ার প্রভাব—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই একজন কিউরেটরকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একই মাঠে ভিন্ন সংস্করণের ক্রিকেট আয়োজনের ক্ষেত্রেও উইকেটের প্রস্তুতিতে আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন হতে পারে। তাই আধুনিক ক্রিকেটে কিউরেটরের দায়িত্ব কেবল পিচ তৈরি করা নয়; বরং পুরো মাঠের প্রস্তুতি ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে তাঁদের কাজ নিবিড়ভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশের আবহাওয়া এই কাজকে আরও কঠিন করে তোলে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টি, উচ্চ আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রার ওঠানামা মাঠ ও পিচ সংরক্ষণে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বৃষ্টির পর দ্রুত মাঠ খেলার উপযোগী করা, টার্ফের স্বাভাবিক অবস্থা ধরে রাখা এবং ম্যাচের আগে উইকেটের কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করতে স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় দেশের মাটি, আবহাওয়া ও ভেন্যুভিত্তিক বাস্তবতা সম্পর্কে অভিজ্ঞ স্থানীয় কিউরেটর তৈরি করা বিসিবির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের পিচ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অতীতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে স্থানীয় জনবলের দক্ষতা বাড়ানো গেলে ধীরে ধীরে সেই নির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে মনে করছে বিসিবি। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার পাশাপাশি নিজেদের কিউরেটরদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও হাতে-কলমে কাজের সুযোগ দেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী স্থানীয় দক্ষতা কাঠামো গড়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রামের এই কর্মশালাকে তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণ আয়োজন হিসেবে দেখছে না বোর্ড। এটি দেশের কিউরেটর ও মাঠকর্মীদের জন্য একটি ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সূচনা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। প্রথম ধাপের কোর্স সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য ভেন্যুর কিউরেটর ও মাঠকর্মীদেরও পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় কিউরেটরদের একটি দক্ষ ও পেশাদার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে এর সুফল ঘরোয়া ক্রিকেটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও পাওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন ভেন্যুতে পিচের মানে ধারাবাহিকতা আনা, স্থানীয় আবহাওয়া অনুযায়ী মাঠ প্রস্তুত করা এবং ম্যাচের প্রয়োজন অনুযায়ী উইকেট তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত জনবল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
দুই দিনের এই কর্মশালায় অংশ নেওয়া ৩০ জন কিউরেটরের মধ্য থেকে যারা পরীক্ষায় সফল হবেন, তাঁরাই লেভেল-১ সনদ পাবেন। এরপর ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানো গেলে দেশের ক্রিকেট অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—পিচ ও মাঠ ব্যবস্থাপনায়—নিজস্ব দক্ষতা আরও সুসংহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিদেশি নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পেশাদার দক্ষতার একটি স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।