বেঙ্গালুরুর ক্রিকেট এক্সিলেন্স সেন্টার দেখতে ভারত যাচ্ছেন তামিম

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবাল ভারত সফরে যাচ্ছেন। তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন বিসিবির গ্রাউন্ডস ও হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) কমিটির চেয়ারম্যান শাহনিয়ান তানিম। বেঙ্গালুরুতে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (বিসিসিআই) আধুনিক সেন্টার অব এক্সিলেন্স পরিদর্শন করাই তাঁদের সফরের প্রধান উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের ক্রিকেট অবকাঠামোকে আরও আধুনিক, সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক করার যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিসিবি হাতে নিয়েছে, সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিসিবি রাজধানীর পূর্বাচলে একটি বিশ্বমানের ক্রিকেট এক্সিলেন্স সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আধুনিক ক্রিকেট উন্নয়নকেন্দ্র কীভাবে পরিচালিত হয়, সেখানে খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার জন্য কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে এবং প্রযুক্তি ও ক্রীড়াবিজ্ঞানকে কীভাবে কাজে লাগানো হয়—এসব বিষয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চায় দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সেই বিবেচনায় বেঙ্গালুরুর সেন্টার অব এক্সিলেন্স পরিদর্শনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আধুনিক ক্রিকেটে খেলোয়াড় উন্নয়ন এখন আর শুধু নেট অনুশীলন কিংবা মাঠের পারফরম্যান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একজন ক্রিকেটারের সামগ্রিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক প্রস্তুতি, কারিগরি দক্ষতা, পুষ্টি, বিশ্রাম, চোট প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা। এর পাশাপাশি খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সের প্রতিটি দিক বিশ্লেষণ করে তথ্যভিত্তিক অনুশীলন পরিকল্পনা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে একটি আধুনিক ক্রিকেট এক্সিলেন্স সেন্টার মূলত খেলোয়াড় তৈরির দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

বেঙ্গালুরু সফরে তামিম ও শাহনিয়ান তানিম এসব ব্যবস্থাপনা সরেজমিনে দেখার সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে খেলোয়াড়দের ফিটনেস মূল্যায়ন, চোটের ঝুঁকি শনাক্তকরণ, পুনর্বাসন কার্যক্রম, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ কীভাবে পরিচালিত হয়, সেসব বিষয়ে ধারণা নেওয়া হবে। বোলিং ও ব্যাটিংয়ের সূক্ষ্ম কারিগরি ত্রুটি শনাক্ত করতে বায়োমেকানিক্সের ব্যবহার, শারীরিক সক্ষমতা পরিমাপে স্পোর্টস সায়েন্স এবং অনুশীলনের কার্যকারিতা বাড়াতে তথ্য বিশ্লেষণের মতো বিষয়ও বাংলাদেশের প্রস্তাবিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পূর্বাচলে পরিকল্পিত এক্সিলেন্স সেন্টারকে শুধু জাতীয় দলের অনুশীলনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের ক্রিকেট উন্নয়নের একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের পাশাপাশি ‘এ’ দল, হাই পারফরম্যান্স ইউনিট এবং বয়সভিত্তিক দলের খেলোয়াড়দের উন্নয়ন কার্যক্রমও এখানে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার পথ আরও পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক করার সুযোগ থাকবে।

বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিয়মিত সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার উঠে এলেও তাঁদের অনেকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে উচ্চমানের ফিটনেস প্রশিক্ষণ, চোট ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন, পুষ্টি, দক্ষতা মূল্যায়ন এবং পারফরম্যান্স বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আরও সমন্বিত অবকাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। পূর্বাচলের প্রস্তাবিত কেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে এসব ঘাটতি অনেকটাই পূরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একটি পূর্ণাঙ্গ এক্সিলেন্স সেন্টারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে খেলোয়াড় উন্নয়নে ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা। উদাহরণ হিসেবে, কোনো পেসারের বোলিং অ্যাকশনে ত্রুটি থাকলে তা প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে সংশোধনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একইভাবে কোনো ব্যাটারের শট নির্বাচনের ধরন, শরীরের ভারসাম্য বা ব্যাটের গতিপথ বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট অনুশীলন পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব। চোটপ্রবণ খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রশিক্ষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা এবং চোটের পর পর্যায়ক্রমে মাঠে ফেরানোর ব্যবস্থাও আরও কার্যকর হতে পারে।

পূর্বাচল স্টেডিয়াম প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক্সিলেন্স সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনাও সম্প্রতি বিসিবির বোর্ড সভায় অনুমোদন পেয়েছে। বুধবার অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে বোর্ড সভাপতি দ্রুত কাজ শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। ফলে বেঙ্গালুরু সফরকে শুধু একটি পরিদর্শন নয়, বরং পূর্বাচলের প্রকল্পের বাস্তব রূপরেখা তৈরির প্রস্তুতিপর্বের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এই সফরের আরেকটি সম্ভাব্য দিক হলো বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক। আগামী সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরে ভারতীয় দলের আসার কথা রয়েছে। তামিমের সফরের সময় দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক সিরিজের সূচি, প্রস্তুতি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়েও মতবিনিময় হতে পারে। তবে সফরের কেন্দ্রীয় লক্ষ্য থাকবে ক্রিকেট অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতা অর্জন এবং পূর্বাচলের প্রস্তাবিত কেন্দ্রের জন্য কার্যকর ধারণা সংগ্রহ।

বেঙ্গালুরুর আধুনিক ক্রিকেট উন্নয়নকেন্দ্র ঘুরে দেখার মাধ্যমে বিসিবির কর্মকর্তারা একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ জনবল ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাবেন। এসব অভিজ্ঞতা পূর্বাচলের কেন্দ্রের নকশা, সুযোগ-সুবিধা ও পরিচালন কাঠামো নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এখন অবকাঠামো উন্নয়নকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ানোর পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে মানসম্পন্ন খেলোয়াড় তৈরি করতে হলে প্রতিভা খোঁজার পর থেকেই তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই জায়গা থেকে তামিম ইকবালের ভারত সফরকে একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা যায়। পূর্বাচলের প্রস্তাবিত ক্রিকেট এক্সিলেন্স সেন্টার বাস্তবে রূপ পেলে তা শুধু জাতীয় দলের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেই নয়, বরং দেশের বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, উচ্চ পারফরম্যান্স কার্যক্রম, খেলোয়াড়দের বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা এবং আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মন্তব্য করুন