ভারতীয় নারী ক্রিকেটে নতুন অধ্যায়: হারমানপ্রীতের বিদায়ে দলের দায়িত্বে স্মৃতি মান্ধানা

ভারতীয় নারী ক্রিকেটে এক ঝোড়ো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু হলো। দলটির দীর্ঘদিনের সফল অধিনায়ক হারমানপ্রীত কৌর হঠাৎ করেই সব ফরম্যাটের নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন দলের নির্ভরযোগ্য বাঁহাতি ওপেনার ও দীর্ঘদিনের সহ-অধিনায়ক স্মৃতি মান্ধানা। ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড বা বিসিসিআই কোনো সময় অপচয় না করে হারমানপ্রীতের পদত্যাগের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন নেত্রী হিসেবে স্মৃতির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। এই আকস্মিক পালাবদল দেশের ক্রিকেট মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার সকালেই নিজের ভেরিফায়েড ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে এক আবেগঘন বার্তার মাধ্যমে নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন হারমানপ্রীত। তার নেতৃত্বে ভারতীয় নারী দল বিশ্ব ক্রিকেটে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তার হাত ধরেই এসেছে ঐতিহাসিক কোনো আইসিসি ইভেন্টের প্রথম ট্রফি এবং এশিয়ান গেমসের সোনা জয়ের গৌরব। তবে পর্দার আড়ালে চলা নানা ঘটনাপ্রবাহ ও বোর্ডের সঙ্গে নীতিগত মতপার্থক্য এই বড় সিদ্ধান্ত নিতে তাকে বাধ্য করেছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
বোর্ডের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, ভারতের টেস্ট ও ওয়ানডে দলের নেতৃত্ব হারমানপ্রীতের হাতেই রাখতে চেয়েছিল বিসিসিআই। তবে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে তাকে সরিয়ে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। এই প্রস্তাব সামনে আসতেই ভীষণ ক্ষুব্ধ হন তিনি। ফলস্বরূপ, কোনো আপস না করে তিন ফরম্যাটের অধিনায়কত্ব থেকেই একসঙ্গে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন এই অভিজ্ঞ ব্যাটার। ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তিনি লিখেছেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। বহু বছরের স্মৃতি, আবেগ এবং আত্মত্যাগ জড়িয়ে রয়েছে এই জার্সির সঙ্গে। দলের স্বার্থে নিজের খেলা ও ব্যক্তিগত অর্জনের সঙ্গেও অনেক সময় আপস করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
হারমানপ্রীতের প্রস্থানের পর থেকেই তার উত্তরসূরি হিসেবে স্মৃতি মান্ধানার নাম নিয়ে জোর আলোচনা চলছিল। ক্রিকেট বিশ্লেষকরাও মানতেন, বর্তমান দলে অভিজ্ঞতার নিরিখে স্মৃতির বিকল্প নেই। বিসিসিআইও ভক্তদের প্রত্যাশায় জল ঢালেনি এবং দ্রুতই তার নাম ঘোষণা করে। মাঠে তার আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি শান্ত স্বভাবের নেতৃত্বগুণ ভারতীয় দলকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস ক্রিকেটপ্রেমীদের।
স্মৃতি মান্ধানার জন্য অবশ্য অধিনায়কত্ব নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। এর আগেও ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিসেবে একাধিক ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন তিনি। ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু দলের অধিনায়ক হিসেবেও তিনি নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। নিচে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিসেবে স্মৃতির পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
ক্রমিক প্রতিপক্ষ বা টুর্নামেন্ট ফরম্যাট ম্যাচ সংখ্যা জয় হার ড্র/টাই সাফল্য হার মন্তব্য
১ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ ওয়ানডে ৪ ৪ ০ ০ ১০০% শতভাগ জয়
২ আন্তর্জাতিক সফর টি-টোয়েন্টি ১৮ ১১ ৬ ১ প্রায় ৬১% ধারাবাহিক পারফরম্যান্স
৩ এশিয়া মহাদেশীয় ম্যাচ টি-টোয়েন্টি ৫ ৪ ১ ০ ৮০% শক্তিশালী নেতৃত্ব
৪ দ্বিপক্ষীয় লড়াই ওয়ানডে ৩ ২ ১ ০ ৬৬% চমৎকার কৌশল
৫ ঘরের মাঠের সিরিজ টি-টোয়েন্টি ৪ ৩ ১ ০ ৭৫% দুর্দান্ত কামব্যাক
৬ ত্রিদেশীয় সিরিজ ওয়ানডে ২ ১ ১ ০ ৫০% সমমানের লড়াই
৭ নিরপেক্ষ ভেন্যু টি-টোয়েন্টি ৩ ২ ১ ০ ৬৬% বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন
৮ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ ওয়ানডে ৩ ২ ১ ০ ৬৬% সিরিজ জয়
৯ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট টি-টোয়েন্টি ৪ ৩ ১ ০ ৭৫% গোছানো খেলা
১০ দ্বিপক্ষীয় লড়াই ওয়ানডে ২ ২ ০ ০ ১০০% নিখুঁত জয়
স্মৃতির সামনে এখন চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। একদিকে হারমানপ্রীতের রেখে যাওয়া সাফল্য ধরে রাখা, অন্যদিকে তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মধ্যে সঠিক সমন্বয় তৈরি করা। আসন্ন আন্তর্জাতিক আসরগুলোতে এই নতুন নেতৃত্বের পারফরম্যান্স কেমন হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

মন্তব্য করুন