ভারতের অধিনায়ক শুবমান গিলের ঐতিহাসিক ডাবল সেঞ্চুরিতে লজ্জার রেকর্ড থেকে বাঁচল বাংলাদেশ

ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য ও রেকর্ড ভাঙা ইনিংস খেলেছেন ভারতের অধিনায়ক শুবমান গিল। গুয়াহাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে মাত্র ১১৭ বলে ডাবল সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে তিনি এই সংস্করণের দ্রুততম দ্বিশতকের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। ইনিংসের শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে তিনি ১৩৩ বলে ২২৩ রানের এক ঝকঝকে ইনিংস উপহার দেন। গিলের এই অতিমানবীয় ইনিংসের সুবাদেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরি হজম করার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ও লজ্জার বিশ্বরেকর্ড থেকে মুক্তি পেল।
এর আগে ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির এই রেকর্ডটি দখলে রেখেছিলেন তরুণ ব্যাটার ঈশান কিষান। ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের একটি ম্যাচে মাত্র ১২৬ বলে ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন তিনি। শুবমান গিল এবার সেই রেকর্ড ভেঙে নিজের নামে নতুন ইতিহাস লিখলেন। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত ২০১ রান টপকে যাওয়ার পথে তিনি পেছনে ফেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার তারকা গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকেও। ওয়ানডে ক্রিকেটে রান তাড়া করার সময় ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ড এতদিন ম্যাক্সওয়েলের দখলে ছিল, যিনি ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১৮১ বলে অপরাজিত ২০১ রান করেছিলেন।
গিলের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এটি দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি। ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে এর আগে কেবল রোহিত শর্মার একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি করার অনন্য কীর্তি ছিল, যার সঙ্গে এবার যুক্ত হলেন শুবমান গিলও। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এটি ১৩তম ডাবল সেঞ্চুরির ঘটনা।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য বেশ সংযতভাবে করেছিলেন গিল। অপরপ্রান্তে অধিনায়ক রোহিত শর্মা শুরু থেকেই ক্যারিবিয়ান বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে মারমুখী ব্যাটিং শুরু করেন। মাত্র ৩৭ বলে ব্যক্তিগত হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছিলেন রোহিত। প্রতিপক্ষ বোলাররা সামান্য লাইন বা লেংথ হারালেই সেটি সীমানাছাড়া করছিলেন তিনি, আর গিল মূলত স্ট্রাইক ঘুরিয়ে তাকে সহায়তা করছিলেন। তবে উইকেটে থিতু হওয়ার পর গিল নিজে আগ্রাসী রূপ ধারণ করেন। পেসারদের বিরুদ্ধে নিখুঁত টাইমিংয়ে মাঠের ফাঁক দিয়ে বল গলিয়ে বাউন্ডারি আদায় করতে থাকেন তিনি।
নিজের প্রথম সেঞ্চুরির পরের অংশে গিলের ব্যাটিংয়ের গতি ছিল আরও অবিশ্বাস্য। মাত্র ২০.১ ওভারে ৬২ বলে নিজের শতক পূর্ণ করেন তিনি। আলজারি জোসেফের বলে লেগ সাইড দিয়ে চার হাঁকিয়ে এই মাইলফলকে পৌঁছান এই ভারতীয় ব্যাটার। এর ঠিক এক ওভার পরেই, অর্থাৎ ২১.১ ওভারের মধ্যে ভারত দলীয় ২০০ রানের কোটা পার করে ফেলে।
ইনিংসের ১১০ থেকে ১২০ রানের ঘর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পার করেন গিল। অন্যপ্রান্তে রোহিত শর্মাও সমানতালে নিজের আক্রমণাত্মক ধারা বজায় রাখেন। ২৫ ওভারের খেলা শেষ হওয়ার আগেই ভারতের সংগ্রহ আড়াইশ রান ছাড়িয়ে যায়, যে সময়ে গিলের ব্যক্তিগত রান ছিল ৮২ বলে ১৪২। এরপর মাত্র ৮৯ বলে দেড়শ রানের ঘরে পৌঁছান তিনি, যা ওয়ানডে ক্রিকেটে যেকোনো ভারতীয় ব্যাটারের মধ্যে দ্রুততম দেড়শ রানের রেকর্ড।
২৯.১ ওভারে ভিটেল লবসের বল চার মেরে তিনি দলকে ৩০০ রানের ঠিকানায় পৌঁছে দেন। ওয়ানডে ইতিহাসের দ্রুততম দলীয় ৩০০ রানের এটিও একটি বড় রেকর্ড। সাবলীলভাবে স্ট্রাইক রোটেট করার পাশাপাশি নিয়মিত চার-ছক্কা হাঁকিয়ে ৯৮ বলে ১৭১ এবং ১০২ বলে ১৭৫ রান পূর্ণ করেন তিনি। বিরাট কোহলি ২৯ রানে সাজঘরে ফিরে যাওয়ার পর গিলের সঙ্গে জুটি বাঁধেন রুতুরাজ গায়কোয়াড়। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং আক্রমণ পুরোপুরি ভেঙে দেন গিল। ১৮০ রানের ঘর পেরিয়ে তিনি পেছনে ফেলে দেন মহেন্দ্র সিং ধোনির ১৮৩ রানের ঐতিহাসিক ইনিংসটিকেও। রান তাড়ার ক্ষেত্রে এতদিন কোনো ভারতীয় ব্যাটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ডটি ধোনির নামেই ছিল।
ম্যাচের ৩৮তম ওভারে চার হাঁকিয়ে ১৯৯ থেকে সরাসরি ডাবল সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যান গিল। এরপর ৩৮.২ ওভারে লবসের বলে এক রান নিয়ে তিনি কাঙ্ক্ষিত ১১৭ বলে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। ১৩১ বলে যখন তার ব্যক্তিগত সংগ্রহ ২২০ রান ছাড়িয়ে যায়, তখন আরেকটি বড় রেকর্ড ভেঙে যায়। ওয়ানডে ক্রিকেটে অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের পূর্ববর্তী রেকর্ডটি ছিল বীরেন্দ্র শেবাগের দখলে, যিনি ২০১১ সালে ইন্দোরে একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েছিলেন। শুবমান গিল সেই রেকর্ডও নিজের নামের পাশে যুক্ত করে নিলেন।

মন্তব্য করুন