অস্ট্রেলিয়ার মাঠে মাত্র দুই দিনে কোনো টেস্ট ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়া নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন একাধিক ঘটনা দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। কিন্তু ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ এরেনায় বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টটি দুই দিনেই গুটিয়ে যাওয়ায় নতুন করে বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দুই দল মিলিয়ে পুরো ম্যাচে খেলা হয়েছে মাত্র ৭৫০ বল, যা টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে বলের হিসেবে চতুর্থ সর্বনিম্ন দৈর্ঘ্যের ম্যাচ। অথচ এত দ্রুত খেলা শেষ হলেও অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যম বা ক্রিকেট মহলে পিচ নিয়ে তেমন সোচ্চার সমালোচনা দেখা যায়নি। ভারতীয় উপমহাদেশে খেলা তিন দিনে গড়ালেই যেখানে পিচের গুণগত মান নিয়ে গেল-গেল রব ওঠে, সেখানে পশ্চিমা দুনিয়ার এই দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভারতীয় ব্যাটিং কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কার।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘স্পোর্টস্টার’-এ প্রকাশিত নিজের নিয়মিত কলামে গাভাস্কার ম্যাকাইয়ের ওই উইকেটকে ‘ট্রাম্পোলিন-বাউন্স’ পিচ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের অযৌক্তিক ফলের পরও পিচের ত্রুটি আড়াল করতে নানা রকম খোঁড়া অজুহাত দাঁড় করানো হয়। বিশেষ করে কিউরেটর বা টার্ফ এক্সিকিউটিভের ভুল কিংবা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা চলে। তিনি খোঁচা দিয়ে বলেন, হয়তো বলা হবে টার্ফ প্রধান রোদের পূর্বাভাসের ওপর ভরসা করে উইকেটে কিছুটা বেশি ঘাস রেখেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত অনিয়ন্ত্রিত বাউন্স তৈরি করেছে।
গাভাস্কার আরও প্রশ্ন তোলেন পিচের দায় ব্যাটারদের টেকনিকের ওপর চাপানোর মানসিকতা নিয়ে। তিনি বলেন, ঘরের মাঠের ব্যাটাররা ভালো রান পেলে না হয় ধরে নেওয়া যেত সফরকারী ব্যাটারদের কারিগরি ঘাটতি ছিল। কিন্তু ম্যাকাইয়ের উইকেটে যখন স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপও ভালো কোনো জুটি গড়ে তুলতে পারেনি, তখন স্রেফ ব্যাটারদের ব্যর্থতা বলে পিচকে কীভাবে দায়মুক্ত করা সম্ভব?
এই কিউরেটিংয়ের পেছনে বোর্ডের অদৃশ্য হাতের ইঙ্গিত দিয়ে গাভাস্কার জানান, এমন পিচ তৈরি হওয়া তাঁর কাছে মোটেও বিস্ময়কর ছিল না। সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের কাছে অপ্রত্যাশিত হারের পর অজিদের অহংকারে আঘাত লেগেছিল। ফলে সিরিজে সমতা ফেরাতে তারা যে মারাত্মক গতি ও বাউন্সের উইকেট চাইবে, তা সহজেই অনুমেয় ছিল। মুখে টিম ম্যানেজমেন্টের সম্পৃক্ততা না থাকার কথা বলা হলেও পর্দার আড়ালে যে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকে, তা ক্রিকেট দুনিয়ার সবারই জানা।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের এই মনোভাবের ঐতিহাসও তুলে ধরেন গাভাস্কার। ২০০০ সালে বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পেলেও তাদের দ্বিতীয় টেস্ট সিরিজের আমন্ত্রণ জানাতে অস্ট্রেলিয়া সময় নিয়েছে দীর্ঘ ২৩ বছর। তাও ম্যাচ দেওয়া হয়েছে প্রধান ভেন্যুগুলোর বাইরে অনিয়মিত এক মাঠে। ভারতের ক্ষেত্রেও ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম সফরের পর দ্বিতীয়বার আমন্ত্রণ পেতে ২০ বছর এবং এরপরের সফরের জন্য আরও ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রমাণ করে, নিজেদের সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরিতে তারা কতটা একগুঁয়ে।