সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হেরে বাংলাদেশের স্বর্ণস্বপ্ন শেষ

এশিয়ান গেমসের পুরুষ ক্রিকেটে সোনার পদক জয়ের লক্ষ্য নিয়ে জাপানে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার আগেই থেমে গেল লিটন দাসের দল। বৃহস্পতিবার নাগোয়ার নিসশিনের কোরোগি স্পোর্টস পার্কে বৃষ্টির কারণে ১৩ ওভারে নামিয়ে আনা সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে ৬ উইকেটে হেরেছে বাংলাদেশ। আগে ব্যাট করে ৭ উইকেটে ১১১ রান তুলেছিল লাল-সবুজের দল। জবাবে ১১.৩ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১১২ রান করে জয় নিশ্চিত করে পাকিস্তান।

এই হারের ফলে বাংলাদেশের সোনা ও রুপা জয়ের সম্ভাবনা শেষ হয়েছে। এখন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ব্রোঞ্জ পদকের জন্য লড়তে হবে দলটিকে। ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে পাকিস্তান।

টসে জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় পাকিস্তান। শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশের ইনিংস। মাত্র ২১ রানের মধ্যে ফিরে যান তিন ব্যাটার। তানজিদ হাসান করেন ৭ রান, অধিনায়ক লিটন দাস ২ এবং পারভেজ হোসেন ইমন ফেরেন মাত্র ১ রান করে। ফলে পাওয়ারপ্লের মধ্যেই চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ।

দলের বিপর্যয়ের মধ্যে কিছুটা প্রতিরোধ গড়েন সাইফ হাসান ও তাওহীদ হৃদয়। সাইফের ব্যাট থেকে আসে ১৯ রান। তবে বাংলাদেশের স্কোরকে লড়াইয়ের উপযোগী পর্যায়ে নেওয়ার মূল দায়িত্ব পালন করেন হৃদয়। মাত্র ২৫ বলে ৪২ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল দুটি চার ও চারটি ছক্কা। মোসাদ্দেক হোসেন করেন ১১ রান। শেষ দিকে মাহেদী হাসানের ৮ রানের সুবাদে নির্ধারিত ১৩ ওভারে ১১১ রান সংগ্রহ করে বাংলাদেশ।

পাকিস্তানের বোলারদের মধ্যে সুফিয়ান মুকিম ছিলেন সবচেয়ে সফল। ২৬ রান দিয়ে তিনটি উইকেট নেন তিনি। আরাফাত মিনহাস পান দুটি উইকেট। বাংলাদেশের ইনিংসে বড় কোনো জুটি না হওয়া এবং শুরুর দিকে দ্রুত উইকেট হারানোই শেষ পর্যন্ত বড় সংগ্রহের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অধিনায়ক লিটনের কাছ থেকেও ব্যাট হাতে প্রত্যাশিত অবদান পাওয়া যায়নি। মাত্র ৩ বলে ২ রান করে সাইম আইয়ুবের বলে বোল্ড হন তিনি। রিভার্স সুইপের চেষ্টা করতে গিয়ে উইকেট হারান বাংলাদেশ অধিনায়ক। দল যখন শুরুতেই বিপর্যস্ত, তখন তাঁর দ্রুত ফিরে যাওয়া চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।

রান তাড়ায় পাকিস্তানের শুরুটাও অবশ্য স্বস্তির ছিল না। ৫৩ রানের মধ্যেই চার উইকেট হারিয়ে বসে তারা। একপর্যায়ে বাংলাদেশের সামনে ম্যাচে ফেরার বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই চাপ ধরে রাখতে পারেনি বোলিং ইউনিট।

পঞ্চম উইকেটে হাসান নওয়াজ ও আবদুল সামাদ দৃশ্যপট বদলে দেন। দুজনের অপরাজিত ৫৯ রানের জুটিতে পাকিস্তান দ্রুত জয়ের পথে এগিয়ে যায়। আবদুল সামাদ মাত্র ১৫ বলে ৩০ রানে অপরাজিত থাকেন। হাসান নওয়াজ ২২ বলে অপরাজিত ২৭ রান করেন। শেষ পর্যন্ত ৯ বল হাতে রেখেই লক্ষ্য পেরিয়ে যায় পাকিস্তান।

ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত আসে দশম ওভারে। তখন পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ৩৬ রান। বল হাতে আসেন মোস্তাফিজুর রহমান। কিন্তু ওই ওভারেই পাকিস্তান তুলে নেয় ২৩ রান। আবদুল সামাদ একটি ছক্কার পাশাপাশি টানা চারটি বাউন্ডারি মেরে ওভারটিকে বড় করে তোলেন। ফলে ছয় বলে পাকিস্তানের সমীকরণ নেমে আসে মাত্র ১৩ রানে। এরপর আর ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ।

মোস্তাফিজ দুই ওভারে ৪১ রান দিয়ে একটি উইকেট নেন। তাঁর শিকার সাইম আইয়ুব। বাংলাদেশের হয়ে মাহেদী হাসান ৩ ওভারে ১৭ রান দিয়ে একটি, নাসুম আহমেদ ৩ ওভারে ৩৩ রান দিয়ে একটি এবং রিশাদ হোসেন ২.৩ ওভারে ১২ রান দিয়ে একটি উইকেট নেন।

ম্যাচ শেষে দলের প্রস্তুতি ও উইকেট সম্পর্কে সীমিত ধারণার বিষয়টি সামনে আনেন লিটন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ম্যাচ না খেলার কারণে দল প্রয়োজনীয় ছন্দে ছিল না। স্থানীয় উইকেটে অনুশীলনের সুযোগও পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে ম্যাচের শুরুতে উইকেট কেমন আচরণ করবে, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছাড়াই খেলতে হয়েছে বাংলাদেশকে। কয়েক ওভার খেলার পর ব্যাটাররা ধীরে ধীরে উইকেটের চরিত্র বুঝতে পারেন।

মিডল ওভারে বোলিং পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়েন অধিনায়ক। প্রথম ওভারে ১৮ রান দেওয়ার পরও কেন মোস্তাফিজকে আবার আক্রমণে আনা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে লিটন তাঁর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, মোস্তাফিজ ওই স্পেলে তিন উইকেট পেলে তখন একই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠত না। সে সময় তাঁর বিবেচনায় মোস্তাফিজই ছিল সেরা বোলিং বিকল্প।

তবে প্রস্তুতি নিয়ে দলের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। ম্যাচের আগে কোচ জানিয়েছিলেন, এমন পরিস্থিতির জন্য দল প্রস্তুত ছিল। ইয়াসির আলী রাব্বিও অনুশীলনের অভাবকে ম্যাচের ফলের সরাসরি কারণ হিসেবে দেখাননি। একই সঙ্গে পাকিস্তানও অনুশীলনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিল। কিন্তু ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাদের ব্যাটাররা দ্রুত রান তুলে চাপ সামলে নেন।

বাংলাদেশের জন্য ম্যাচটির আরেকটি বড় শিক্ষা ছিল ছোট সংস্করণের ক্রিকেটে শুরুটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ১৩ ওভারের ম্যাচে দ্রুত উইকেট হারালে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় থাকে খুব কম। বাংলাদেশ ২১ রানের মধ্যেই তিন উইকেট হারানোর পর হৃদয়ের ঝড়ো ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও ১১১ রান শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট হয়নি।

অন্যদিকে পাকিস্তান ৫৩ রানে চার উইকেট হারিয়েও শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি নিজেদের করে নেয়। বিশেষ করে সামাদ ও হাসানের অপরাজিত জুটি বাংলাদেশের বোলিং পরিকল্পনাকে ভেঙে দেয়। মোস্তাফিজের এক ওভারে ২৩ রান যাওয়ার পর পাকিস্তানের জন্য সমীকরণও সহজ হয়ে যায়।

ফলে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের স্বর্ণপদকের স্বপ্ন আপাতত শেষ। ফাইনালের পরিবর্তে এখন তাদের লক্ষ্য ব্রোঞ্জ। সেমিফাইনালের ভুলগুলো পেছনে ফেলে শেষ ম্যাচে দলটি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেটিই হবে লিটনদের সামনে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্য করুন