ডারউইন টেস্টে ব্যাটিং ও বোলিং—দুই ক্ষেত্রেই দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রেখেছে বাংলাদেশ। ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রুত কয়েকটি উইকেট তুলে নিয়ে টাইগাররা স্বাগতিকদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভাগ্যের সহায়তা পাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা। কখনো প্রযুক্তির সিদ্ধান্তে, আবার কখনো ক্রিকেটের অদ্ভুত নিয়মের কারণে সম্ভাব্য উইকেট হাতছাড়া হচ্ছে বাংলাদেশের।
শনিবার (১৫ আগস্ট) অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে ক্যামেরন গ্রিনকে ঘিরে। ইনিংসের ৩১তম ওভারে তাসকিন আহমেদের করা একটি বল গ্রিনের ব্যাটের কানায় লেগে সরাসরি লেগ স্টাম্পে আঘাত করে। বল স্টাম্পে লাগার দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল, অস্ট্রেলিয়ার আরেকটি উইকেট নিশ্চিত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
স্টাম্পে বলের আঘাত লাগলেও দুটি বেলসই নিজেদের জায়গায় অক্ষত ছিল। ফলে উইকেট ভাঙেনি এবং গ্রিনও আউট হননি। টেলিভিশন রিপ্লেতে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়, বলটি স্টাম্পে স্পর্শ করেছে। কিন্তু ক্রিকেটের আইনে শুধু স্টাম্পে বলের আঘাত লাগাই ব্যাটারকে বোল্ড আউট করার জন্য যথেষ্ট নয়। বেলসকে স্টাম্পের ওপর থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যেতে হয়, অথবা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্টাম্প মাটি থেকে উঠে যেতে হয়। সেই শর্ত পূরণ না হওয়ায় গ্রিনকে আউট দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
ঘটনাটি মাঠের বাইরেও বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। ধারাভাষ্যকক্ষে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার অ্যালিসা হিলি রসিকতা করে প্রশ্ন তোলেন, ট্র্যাভিস হেড কি বেলসগুলোতে আঠা লাগিয়ে গিয়েছিলেন? অস্বাভাবিক দৃশ্যটি মুহূর্তেই ম্যাচের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে।
গ্রিনের এই বেঁচে যাওয়া অবশ্য এই টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ভাগ্য সহায়তার একমাত্র উদাহরণ নয়। প্রথম ইনিংসেও স্টিভেন স্মিথকে ঘিরে প্রায় একই ধরনের হতাশাজনক পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ।
ইবাদত হোসেনের একটি ডেলিভারি স্মিথের ব্যাটের কাছ দিয়ে যাওয়ার পর উইকেটরক্ষক লিটন দাসের গ্লাভসে জমা পড়ে। বাংলাদেশ উইকেটের জন্য আবেদন করলেও মাঠের আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা আউট দেননি। এরপর বাংলাদেশ রিভিউ নেয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় আল্ট্রএজে ব্যাট ও বলের সংস্পর্শের যথেষ্ট পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে মাঠের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মতো নিশ্চিত প্রমাণ না থাকায় স্মিথকে নটআউটই থাকতে হয়।
ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে স্মিথের নিজের বক্তব্য। ম্যাচের পর তিনি জানান, বল ব্যাটে লাগার অনুভূতি তিনি পেয়েছিলেন। ফলে বাংলাদেশের জন্য হতাশার কারণ আরও বেড়ে যায়। মাঠে থাকা অনুভূতি এবং প্রযুক্তিতে পাওয়া প্রমাণের মধ্যে এমন পার্থক্য ক্রিকেটে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।
দুই ঘটনাই দেখিয়ে দিয়েছে, টেস্ট ক্রিকেটে একটি উইকেট নিশ্চিত করার আগে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বোলারের দুর্দান্ত ডেলিভারি কিংবা ফিল্ডারের অসাধারণ প্রচেষ্টার পরও কখনো কখনো সামান্য একটি নিয়ম, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বা নিছক ভাগ্য ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ডারউইন টেস্টে তাদের বোলাররা নিয়মিত অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে ফেলেছে। নতুন বলে নিয়ন্ত্রিত বোলিং, ধারাবাহিক লাইন-লেন্থ এবং দ্রুত উইকেট তুলে নেওয়ার ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু তৈরি করা সুযোগগুলো কাজে লাগাতে না পারলে সেই চাপ দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের একটি অতিরিক্ত জীবন অনেক বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। একজন ব্যাটার একবার সুযোগ পেয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে বড় ইনিংস গড়ে দলকে বিপদ থেকে বের করে আনতে পারেন। তাই গ্রিনের ক্ষেত্রে স্টাম্পে বল লাগার পরও বেলস না পড়ার ঘটনাটি নিছক কৌতূহলোদ্দীপক দৃশ্য নয়; বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সম্ভাব্য উইকেট হারানোর ঘটনাও।
ডারউইন টেস্ট যত এগোবে, বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে চাপকে আরও বাড়িয়ে যাওয়া এবং সুযোগ পেলেই তা উইকেটে রূপান্তর করা। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় বড় কোনো মুহূর্তে নয়, বরং এমন ছোট ছোট ঘটনার সমষ্টিতেই নির্ধারিত হয়। গ্রিনের অস্বাভাবিকভাবে বেঁচে যাওয়া সেই বাস্তবতারই আরেকটি স্মরণীয় উদাহরণ।