২০২৮ বিশ্বকাপ ঘিরে ক্রিকেটে প্রস্তুতি জোরদার সৌদি আরবের

২০২৮ সালের আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার লক্ষ্য নিয়ে ক্রিকেট উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিজ্ঞতা বাড়ানো, স্থানীয় খেলোয়াড়দের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পেশাদার ক্রিকেটের পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় দেশটি। এশিয়ার উপ-আঞ্চলিক বাছাইপর্বে টানা পাঁচ ম্যাচে জয় সেই স্বপ্ন পূরণের পথে সৌদি দলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।

গত ৫ থেকে ১৪ অক্টোবর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত বাছাইপর্বে ১৩টি দল দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। গ্রুপ ‘বি’-তে অংশ নিয়ে পাঁচ ম্যাচের সব কটিতেই জয় পায় সৌদি আরব। ফলে গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে তারা। একই গ্রুপ থেকে পরবর্তী ধাপে উঠেছে হংকং ও মালয়েশিয়া। অন্যদিকে, গ্রুপ ‘এ’ থেকে জায়গা করে নিয়েছে কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার।

২০২৭ সালে এশীয় আঞ্চলিক ফাইনালে এই ছয় দল মুখোমুখি হবে। সেখানে সেরা দুটি দল বৈশ্বিক বাছাইপর্বের প্লে-অফে খেলার সুযোগ পাবে। ১৬ দলের ওই প্রতিযোগিতা থেকে আটটি দল ২০২৮ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেবে। ফলে সৌদি আরবকে বিশ্বকাপের টিকিট পেতে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পেরোতে হবে।

আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জ

বাছাইপর্বে দারুণ সাফল্য পেলেও সৌদি আরবের সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের বিপক্ষে অতীতের ফলাফল বলছে, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দলটিকে আরও উন্নতি করতে হবে।

২০১৯ সালের পর থেকে কাতারের বিপক্ষে ১১টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে মাত্র তিনটিতে জয় পেয়েছে সৌদি আরব। কুয়েতের বিপক্ষে সাত ম্যাচে তাদের জয় তিনটি। বাহরাইনের বিপক্ষে ছয় ম্যাচে জয় এসেছে মাত্র দুটিতে।

আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও সৌদি আরব পিছিয়ে। দেশটি এখন পর্যন্ত ৬২টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে। অন্যদিকে, বাহরাইন খেলেছে ১৩৪টি, কাতার ৯০টি এবং কুয়েত ৮৮টি ম্যাচ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত অংশগ্রহণ খেলোয়াড়দের কৌশলগত দক্ষতা বাড়ানো, চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ করে দেয়। তাই বিশ্বকাপের পথে এগোতে হলে সৌদি আরবকে শুধু জয় ধরে রাখলেই হবে না, অভিজ্ঞতার ঘাটতিও কাটিয়ে উঠতে হবে।

অবকাঠামো উন্নয়নেও নজর দিতে হবে

সৌদি ক্রিকেটের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক মানের মাঠের অভাব। দেশটিতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের উপযোগী পর্যাপ্ত ক্রিকেট অবকাঠামো না থাকায় জাতীয় দলের বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক ম্যাচ কাতার ও ওমানে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নিজস্ব মাঠ ও উন্নত প্রশিক্ষণসুবিধা গড়ে তোলা গেলে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ বাড়বে। এতে স্থানীয় খেলোয়াড়দের পাশাপাশি দর্শক ও তরুণ ক্রিকেটারদেরও খেলাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করতেও এসব উদ্যোগ সহায়ক হতে পারে।

তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত ঘরোয়া প্রতিযোগিতা, মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দলগুলোর সঙ্গে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার পরিকল্পনা

সৌদি আরব ক্রিকেট ফেডারেশনের মহাব্যবস্থাপক ইকবাল সিকান্দার জানিয়েছেন, দেশটির ক্রিকেট এখন আরও সুসংগঠিত পর্যায়ে প্রবেশ করছে। খেলার মান বাড়ানো, প্রতিযোগিতার পরিসর সম্প্রসারণ এবং খেলোয়াড়দের জন্য পেশাদার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

খেলোয়াড়দের বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ দিতে দ্বিপক্ষীয়, ত্রিদেশীয় ও চার জাতির সিরিজ আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে সৌদি ক্রিকেটাররা বিভিন্ন ধরনের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। একই সঙ্গে দলের কৌশলগত প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রিকেটীয় সহযোগিতাও সৌদি আরবের উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রশিক্ষণ, কোচিং এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে দেশটির ক্রিকেট কাঠামো আরও শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে বাড়ছে স্থানীয়দের সুযোগ

সৌদি ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা বাড়াতে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ডিপি ওয়ার্ল্ড আইএলটি-টোয়েন্টি লিগের দলগুলোকে অন্তত একজন সৌদি ক্রিকেটার রাখতে হচ্ছে। ২০২৬ সালের আসরের জন্য ছয় সৌদি ক্রিকেটারের মধ্যে চারজনকে দলে নেওয়া হয়েছে।

ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগ স্থানীয় ক্রিকেটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারেন। পেশাদার ক্রিকেটের পরিবেশে খেলার অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক ম্যাচে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেও ইতিবাচকভাবে যুক্ত হতে পারে।

এরই মধ্যে নজর কেড়েছেন সৌদি ক্রিকেটার ইশতিয়াক আহমেদ। ১১ অক্টোবর হংকংয়ের বিপক্ষে সৌদি আরবের ১০ রানের জয়ে চারটি উইকেট নেন তিনি। তাঁর শিকারগুলোর মধ্যে ছিল হ্যাটট্রিক। এমন পারফরম্যান্স দলের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়ার পাশাপাশি অন্য খেলোয়াড়দেরও ভালো করার অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে।

নারী ক্রিকেটের বিকাশেও উদ্যোগ

পুরুষদের ক্রিকেটের পাশাপাশি নারী ক্রিকেটের উন্নয়নেও কাজ করছে সৌদি আরব। খেলাটির বিস্তার ঘটাতে নারী ক্রিকেটারদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি আন্তর্জাতিক নারী টুর্নামেন্ট এবং পুরুষদের ‘ডিউনস টোয়েন্টি’ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ কারিগরি কারণে পিছিয়ে গেছে।

নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজন করা গেলে নারী ও পুরুষ—উভয় বিভাগের খেলোয়াড়দের ম্যাচ খেলার সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ তৈরি এবং নতুন প্রতিভা বিকাশের পথও প্রসারিত হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ২০২৮ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার লক্ষ্য সৌদি আরবের জন্য বড় পরীক্ষা। উপ-আঞ্চলিক বাছাইপর্বে টানা পাঁচ জয় দলটির অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও সামনে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে। আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা বাড়ানো, খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করা, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে অংশগ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—এই ক্ষেত্রগুলোতে ধারাবাহিক অগ্রগতিই বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মন্তব্য করুন

Are you human? Please solve:Captcha