সাকিবসহ ১৫ জনের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ফের পেছাল

শেয়ারবাজারে কারসাজি, প্রতারণামূলক লেনদেন এবং ২৫৬ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় আবারও পিছিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে না পারায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সোমবার (২৭ জুলাই) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ও সিনিয়র বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. শাহজাহান কবির আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেন। এর আগে একই দিন, অর্থাৎ ২৭ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারিত ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হওয়ায় দুদক আদালতের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করে। পরে আদালত নতুন তারিখ ঘোষণা করেন। দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগের সরকারি পরিচালক আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মামলাটি গত বছরের ১৭ মে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন বাদী হয়ে দায়ের করেন। মামলায় সাকিব আল হাসান ছাড়াও সমবায় অধিদপ্তরের উপ-নিবন্ধক আবুল খায়ের, তাঁর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান, আবুল কালাম মাদবর, কনিকা আফরোজ, মোহাম্মদ বাশার, সাজেদ মাদবর, আলেয়া বেগম, কাজী ফুয়াদ হাসান, কাজী ফরিদ হাসান, জাভেদ এ মতিন, জাহেদ কামাল, হুমায়ূন কবির ও তানভির নিজামকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে সংঘবদ্ধভাবে কারসাজি, প্রতারণামূলক লেনদেন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেনিফিশিয়ারি ওনার্স বা বিও হিসাব ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে একাধিক লেনদেন করতেন। এসব লেনদেনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারের কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে বাজারদর বাড়ানোর পরিবেশ সৃষ্টি করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, একটি সংঘবদ্ধ চক্র শেয়ার কেনাবেচার ধারাবাহিক লেনদেনের মাধ্যমে বাজারে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যাতে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়ে যায়। পরে বাজারদর বাড়ার প্রবণতা দেখে অনেক বিনিয়োগকারী ওই শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু কারসাজির মাধ্যমে তৈরি করা মূল্যস্তর ধরে রাখতে না পারায় পরবর্তী সময়ে শেয়ারের দাম কমে যায় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন বলে মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছে।

দুদকের অভিযোগ অনুসারে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসামিরা ২৫৬ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার ৩০৪ টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেন। মামলার অভিযোগে এই অর্থকে অস্বাভাবিক মূলধন লাভ হিসেবে দেখানো হলেও তদন্তকারী সংস্থার দাবি, প্রকৃতপক্ষে এসব অর্থ অপরাধলব্ধ আয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

মামলার এজাহারে মো. আবুল খায়ের হিরুর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, শেয়ারবাজার থেকে উত্তোলিত অর্থের মধ্যে ২৯ কোটি ৯৪ লাখ ৪২ হাজার ১৮৫ টাকা তাঁর স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসানের সহযোগিতায় বিভিন্ন খাতে স্থানান্তর করা হয়। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থের এই স্থানান্তরের মাধ্যমে এর প্রকৃত উৎস আড়াল করার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।

এ ছাড়া হিরুর নামে পরিচালিত ১৭টি ব্যাংক হিসাবে মোট ৫৪২ কোটি ৩১ লাখ ৫১ হাজার ৯৮২ টাকার অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক ও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব লেনদেনের প্রকৃতি, অর্থের উৎস, সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোর ব্যবহার এবং আসামিদের পারস্পরিক সম্পৃক্ততা তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে অভিযোগের বিবরণ থেকে জানা যায়।

সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধেও নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজার কারসাজিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, আবুল খায়ের হিরুর বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ থাকা প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এবং সোনালী পেপারস লিমিটেডের শেয়ারে সাকিব বিনিয়োগ করেছিলেন। দুদকের অভিযোগ, এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি কথিত বাজার কারসাজির কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সংশ্লিষ্ট শেয়ারে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখেন।

এজাহারে আরও দাবি করা হয়েছে, সাকিব আল হাসান শেয়ারবাজার থেকে ২ কোটি ৯৫ লাখ ২ হাজার ৯১৫ টাকা ‘রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইন’ হিসেবে উত্তোলন করেন। দুদকের অভিযোগে এই অর্থকেও অপরাধলব্ধ আয়ের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে মামলায় আনা এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত শেষ হওয়া এবং তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তে কী কী তথ্য উঠে এসেছে, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি কতটা শক্তিশালী এবং মামলাটি পরবর্তী সময়ে কোন পথে এগোবে—তা আরও স্পষ্ট হতে পারে।

এখন আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হয় কি না, সেটিই মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পিছিয়ে যাওয়ায় মামলার অগ্রগতি নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে তদন্তাধীন এ মামলার অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

মন্তব্য করুন