পাঁচ বছর পর সৌম্য, অস্ট্রেলিয়া সিরিজে বাংলাদেশের দলে বড় পরিবর্তন

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশ দলে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। চোটের কারণে কয়েকজন নিয়মিত ক্রিকেটারকে না পাওয়ায় নির্বাচকদের সামনে দল গঠনের সমীকরণ কিছুটা জটিল হয়ে উঠেছিল। একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের চার দিনের ম্যাচের সূচিও বিবেচনায় রাখতে হয়েছে। সব মিলিয়ে আসন্ন সিরিজের জন্য অভিজ্ঞ ও প্রস্তুত ক্রিকেটার বেছে নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের টেস্ট দলের জন্য সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের প্রস্তুত করার দিকেও নজর দিয়েছেন নির্বাচকেরা।

দল ঘোষণার পর সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলেন, চোটজনিত সমস্যার কারণে এবার দল নির্বাচন সহজ ছিল না। তবে শুধু অস্ট্রেলিয়া সিরিজের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। দীর্ঘমেয়াদে টেস্ট দলের জন্য ক্রিকেটারদের প্রস্তুত করাও ছিল পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই অস্ট্রেলিয়া সফরের দলে জায়গা না পাওয়া তাওহিদ হৃদয়, মাহমুদুল হাসান ও মাহিদুল ইসলামকে দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচ খেলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচকদের যুক্তি, জাতীয় দলের বাইরে থাকলেও প্রতিযোগিতামূলক দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটে নিয়মিত খেলার সুযোগ পেলে এসব ক্রিকেটার নিজেদের আরও পরিণত করে তুলতে পারবেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচ তাঁদের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পাঁচ বছর পর টেস্ট দলে সৌম্য

এবারের দল ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ওপেনিংয়ে পরিবর্তন নিয়ে। মাহমুদুল হাসান জয়কে বাদ দিয়ে প্রায় পাঁচ বছর পর টেস্ট দলে ফিরেছেন সৌম্য সরকার। বাঁহাতি এই ব্যাটার সর্বশেষ ২০২১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট খেলেছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময় সাদা পোশাকের ক্রিকেটে জাতীয় দলের বাইরে থাকলেও ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজের সামর্থ্য ধরে রেখেছেন তিনি।

জাতীয় ক্রিকেট লিগের সর্বশেষ আসরে সৌম্যের পারফরম্যান্সই তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রধান ভিত্তি। সাত ম্যাচে ৪৫.২১ গড়ে ৬৩৩ রান করে তিনি প্রতিযোগিতাটির সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন। দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটে নিয়মিত রান করার এই সক্ষমতা নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং দ্রুতগতির বোলিং মোকাবিলার দক্ষতাও অস্ট্রেলিয়া সফরের দল নির্বাচনে তাঁকে এগিয়ে দিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য চ্যালেঞ্জটা অন্যরকম। গতি ও বাউন্সের পাশাপাশি নতুন বলে সুইং এবং ধারাবাহিক পেস আক্রমণের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করতে হয়। সেখানে অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচকদের বিবেচনায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন খেলার অভিজ্ঞতা থাকা সৌম্য কঠিন কন্ডিশনে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকবেন।

ছন্দ ফেরানোর সুযোগ জয়ের সামনে

অন্যদিকে মাহমুদুল হাসান জয়ের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে। ওপেনিংয়ে তাঁর সর্বশেষ ছয় ইনিংসের চারটিতেই তিনি এক অঙ্কের রানে আউট হয়েছেন। ওই সময়ের মধ্যে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে মাত্র একটি অর্ধশতক।

অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠিন কন্ডিশনে এমন অনিশ্চিত ফর্ম নিয়ে সরাসরি খেলানোর বদলে জয়কে কিছুটা সময় দিয়ে আত্মবিশ্বাস ও ব্যাটিং ছন্দ ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেওয়াকেই কার্যকর মনে করেছেন নির্বাচকেরা। তাছাড়া অস্ট্রেলিয়া সফরে তাঁর একাদশে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও সীমিত হতে পারে। ফলে জাতীয় দলের বাইরে থেকেও প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরে নিজের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ তাঁর সামনে থাকছে।

হৃদয়ের জন্য ‘এ’ দলে খেলার সুযোগ

মাঝের সারির ব্যাটিংয়েও এসেছে পরিবর্তন। গত মাসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে অভিষেক হয়েছিল তাওহিদ হৃদয়ের। তবে অভিষেক ম্যাচটি তাঁর জন্য প্রত্যাশামতো হয়নি। বাংলাদেশের ইনিংস ব্যবধানে হারা সেই ম্যাচে দুই ইনিংসে তাঁর সংগ্রহ ছিল যথাক্রমে ২ ও ৯ রান।

অস্ট্রেলিয়া সফরের দলে জায়গা না পেলেও হৃদয়কে জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বাইরে রাখা হয়নি। বরং তাঁকে আরও প্রস্তুত করে তোলার লক্ষ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মেহেদী হাসান মিরাজ দলে ফেরায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হৃদয়ের একাদশে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। তাই কঠিন সিরিজে দলের বাইরে থেকে অনুশীলনে সময় কাটানোর পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক চার দিনের ক্রিকেটে তাঁকে খেলার সুযোগ দেওয়াকে বেশি ফলপ্রসূ মনে করেছেন নির্বাচকেরা।

এ ধরনের ম্যাচ হৃদয়ের জন্য ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করবে। টেস্ট ক্রিকেটে সফল হতে হলে শুধু প্রতিভা নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী ইনিংস গড়ে তোলা এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতাও প্রয়োজন। সেই প্রস্তুতির ক্ষেত্রেই ‘এ’ দলের ম্যাচগুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

মাহিদুলেরও নজর দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটে

একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাচ্ছেন মাহিদুল ইসলাম। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট দলে থাকলেও একাদশে জায়গা হয়নি এই উইকেটকিপার-ব্যাটারের। অস্ট্রেলিয়া সফরের দলেও জায়গা হয়নি তাঁর।

তবে জাতীয় দলের বাইরে থাকার সময়টাকে নিষ্ক্রিয় না রেখে ‘এ’ দলের হয়ে চার দিনের ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাচ্ছেন মাহিদুল। এই ম্যাচগুলোতে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি উইকেটকিপিংয়েও নিজেকে আরও পরিণত করার সুযোগ থাকবে তাঁর সামনে। টেস্ট ক্রিকেটে উইকেটকিপারের ভূমিকা দীর্ঘ সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নিয়মিত চার দিনের ম্যাচ খেলা তাঁর প্রস্তুতিতে সহায়ক হতে পারে।

দীর্ঘ বিরতির পর ফিরলেন জাকের

অস্ট্রেলিয়া সফরের দলে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে উইকেটকিপিং বিভাগে। গত বছরের জুনে সর্বশেষ টেস্ট খেলা জাকের আলী দীর্ঘ বিরতির পর আবারও জাতীয় দলের সাদা পোশাকে ফিরেছেন।

জাতীয় দলের বাইরে থাকার সময় তিনি হাই পারফরম্যান্স কর্মসূচির ম্যাচগুলোতে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। সেখানকার পারফরম্যান্স ও প্রস্তুতি মূল্যায়ন করেই তাঁকে আবার টেস্ট দলে ফেরানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচক। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে উইকেটের পেছনে দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি ব্যাট হাতেও দলের জন্য অবদান রাখার সুযোগ থাকবে তাঁর।

সামনে কঠিন অস্ট্রেলিয়া পরীক্ষা

বাংলাদেশের জন্য অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলা বরাবরই বড় চ্যালেঞ্জ। কন্ডিশনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া, নতুন বল সামলানো এবং পেস ও বাউন্সের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করা—সবকিছুই সফরকারী দলের জন্য কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে প্রথম ঘণ্টার ব্যাটিং ম্যাচের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন বলের আক্রমণ সামলে উইকেট ধরে রাখা যেমন জরুরি, তেমনি সুযোগ পেলে রান করার মানসিকতাও ধরে রাখতে হয়। দীর্ঘ ইনিংস গড়তে প্রয়োজন টেকনিক্যাল দৃঢ়তা, ধৈর্য এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করার ক্ষমতা। এই জায়গায় সৌম্যের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাইছে বাংলাদেশ।

একই সঙ্গে নির্বাচকদের সিদ্ধান্তে আরও একটি দিক স্পষ্ট হয়েছে। জাতীয় দলের বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের কেবল অপেক্ষায় না রেখে তাঁদের প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। হৃদয়, জয় ও মাহিদুলদের মতো খেলোয়াড়দের জন্য এই সময়টা নিজেদের ঘাটতি পূরণ ও ছন্দ ফিরে পাওয়ার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

সূচি অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে ২২ আগস্ট ম্যাকাইতে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিং দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের প্রথম চার দিনের ম্যাচ শুরু হবে ১৬ আগস্ট এবং দ্বিতীয় ম্যাচ মাঠে গড়াবে ২৩ আগস্ট।

ফলে এবারের দল নির্বাচনকে শুধু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই টেস্টের জন্য তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না। একদিকে কঠিন কন্ডিশনে অভিজ্ঞ ও প্রস্তুত ক্রিকেটারদের নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার লক্ষ্য রয়েছে, অন্যদিকে জাতীয় দলের বাইরে থাকা সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের চার দিনের ক্রিকেটে আরও পরিণত করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

পাঁচ বছর পর সৌম্য সরকারের টেস্ট দলে প্রত্যাবর্তন তাই একদিকে যেমন বর্তমান পরিস্থিতির প্রয়োজন মেটানোর সিদ্ধান্ত, তেমনি তাওহিদ হৃদয়, মাহমুদুল হাসান ও মাহিদুল ইসলামকে ‘এ’ দলের হয়ে খেলানোর পরিকল্পনা বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েও নির্বাচকদের ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মন্তব্য করুন