লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে (এলপিএল) আবারও ব্যাট হাতে নিজের বিস্ফোরক সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন বাংলাদেশের তরুণ ব্যাটার তাওহীদ হৃদয়। জাফনা কিংসের হয়ে কলম্বো স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে ম্যাচে ইনিংসের একেবারে শেষ মুহূর্তে নেমে মাত্র ৮ বলে ৩১ রানের অপরাজিত ঝোড়ো ইনিংস খেলেছেন তিনি। তার বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে দলের স্কোর দ্রুত দুইশ ছাড়িয়ে যায়। তবে ম্যাচে হৃদয়ের ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে গ্যালারির এক দর্শকের দুর্দান্ত ক্যাচ।
হৃদয়ের মারা একটি ছক্কা অসাধারণ দক্ষতায় তালুবন্দী করে ওই দর্শক জিতে নিয়েছেন ১ লাখ টাকা পুরস্কার। মাঠের বাইরে বসে থেকেও এমন দুর্দান্ত ক্যাচ নেওয়ার পর মুহূর্তেই তিনি দর্শকদের নজর কাড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বলটি গ্যালারির দিকে উড়ে আসার পর যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে সেটি ধরে ফেলেন তিনি। ক্যাচটি নেওয়ার পর তার উচ্ছ্বাসও ছিল দেখার মতো।
ম্যাচের শেষ ওভারে হৃদয়ের ব্যাটিং ছিল একেবারেই অন্য রকম। শুরুতে প্রথম দুই বলে তিনি মাত্র ১ রান নেন। এরপরই যেন বদলে যায় তার ব্যাটিংয়ের গতি। পাকিস্তানি পেসার শাহনেওয়াজ দাহানির করা ওভারের পরের বলগুলোতে একের পর এক আক্রমণাত্মক শট খেলতে শুরু করেন বাংলাদেশের এই ডানহাতি ব্যাটার। ওভারে চারটি ছক্কা ও একটি চার মেরে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই ৩১ রান পূর্ণ করেন।
হৃদয়ের ৮ বলের ইনিংসে ছিল চারটি ছক্কা ও একটি চার। হিসাব করলে দেখা যায়, বাউন্ডারি থেকেই তিনি করেছেন ২৮ রান। অর্থাৎ তার ইনিংসের প্রায় পুরোটা জুড়েই ছিল আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের ছাপ। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শেষ দিকে এমন দ্রুত রান তোলার ক্ষমতা দলের স্কোরকে বড় সংগ্রহে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাফনা কিংসের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে।
হৃদয়ের ব্যাট থেকে ছক্কা হয়ে গ্যালারিতে যাওয়া বলগুলোর একটি সরাসরি ওই দর্শকের হাতে ধরা পড়ে। সাধারণত ক্রিকেট ম্যাচে গ্যালারিতে ছক্কা গিয়ে দর্শকের হাতে পৌঁছানো স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু সেই বলটি যদি সরাসরি ক্যাচে পরিণত হয়, তাহলে মুহূর্তটি আলাদা গুরুত্ব পায়। তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় নগদ ১ লাখ টাকার পুরস্কার, তাহলে ঘটনাটি ম্যাচের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক।
দর্শকের এই সৌভাগ্যে নিজেও আনন্দ প্রকাশ করেছেন হৃদয়। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ক্যাচের ভিডিও শেয়ার করে ওই দর্শকের উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা দেন তিনি। সেখানে হৃদয় লেখেন, ‘ভাই, নিজের চেয়েও তোমার জন্য আমি বেশি খুশি। ওই ক্যাচটার জন্য তুমি ১ লাখ টাকা পাবে—এ খবরটা শুনে ঠিক কী অনুভূতি হয়েছিল, সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। অনেক ভালোবাসা রইল।’
শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, দলীয় দিক থেকেও ম্যাচটি ছিল হৃদয়ের জন্য সফল। প্রথমে ব্যাট করে জাফনা কিংস ২০২ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায়। নির্ধারিত রান তাড়ায় কলম্বো স্ট্রাইকার্স ১৮৩ রানের বেশি করতে পারেনি। ফলে ১৯ রানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে জাফনা কিংস। বড় লক্ষ্য দাঁড় করানোর পথে ইনিংসের শেষ দিকে হৃদয়ের দ্রুত রান সংগ্রহ দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ইনিংসের শেষ কয়েকটি বলকে অনেক সময় ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। কারণ ওই সময়ে ব্যাটাররা ঝুঁকি নিয়ে বড় শট খেলার চেষ্টা করেন এবং কয়েকটি বাউন্ডারিই দলের মোট সংগ্রহে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। হৃদয়ের ৮ বলে ৩১ রানের ইনিংস তারই একটি উদাহরণ। অল্প সময়ে ৩১ রান যোগ করে তিনি শুধু নিজের স্ট্রাইক রেটই বাড়াননি, দলের স্কোরও এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখান থেকে প্রতিপক্ষের জন্য রান তাড়া করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চলতি এলপিএলে হৃদয়ের এটি ছিল দ্বিতীয় ম্যাচ। এর আগে ক্যান্ডির বিপক্ষেও ব্যাট হাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। সেই ম্যাচে ২১ বলে ৩৫ রান করেছিলেন বাংলাদেশের এই ব্যাটার। ফলে টুর্নামেন্টের শুরুতেই পরপর দুই ম্যাচে রান পাওয়ায় তার ব্যাটিং ছন্দে থাকার ইঙ্গিত মিলছে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে তাওহীদ হৃদয়কে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ তার অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করার দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টিতে বিভিন্ন দেশের বোলার ও ভিন্ন ধরনের কন্ডিশনের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা একজন ব্যাটারের প্রস্তুতিকে আরও সমৃদ্ধ করে।
কলম্বো স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে ম্যাচে তাই হৃদয়ের জন্য একসঙ্গে এসেছে দুটি আনন্দের মুহূর্ত। একদিকে মাত্র ৮ বলে ৩১ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলে জাফনা কিংসকে বড় সংগ্রহ গড়তে সহায়তা করেছেন তিনি। অন্যদিকে তার মারা ছক্কার বল ধরে এক দর্শক পেয়েছেন ১ লাখ টাকার পুরস্কার। হৃদয়ের ব্যাটিং, জাফনা কিংসের ১৯ রানের জয় এবং গ্যালারিতে সেই দুর্দান্ত ক্যাচ—সব মিলিয়ে ম্যাচটি হয়ে উঠেছে এলপিএলের এবারের আসরের স্মরণীয় এক ঘটনা।