ভারত সিরিজ নিয়ে শেষ মুহূর্তেও আশাবাদী বিসিবি

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সেপ্টেম্বরে ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টির সাদা বলের সিরিজ আয়োজনের বিষয়ে এখনো আশা ছাড়েনি। তবে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নতুন টানাপোড়েনে সিরিজটি নির্ধারিত সময়ে মাঠে গড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সময়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সূচি অনুযায়ী, ছয় ম্যাচের সিরিজ খেলতে ২৮ আগস্ট বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ভারতীয় দলের।

বিসিবির কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। সে ক্ষেত্রে ক্রিকেটীয় আয়োজনটি নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতাও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই আশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব ক্রিকেটের ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে দিল্লি থেকে আওয়ামী লীগের ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ দেওয়ার ঘটনাকে ঘিরে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ৮ আগস্ট বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে ভারতের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে এমন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা বাড়ায়, সে ক্ষেত্রে দিল্লির পক্ষে ঢাকার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার দাবি করা কঠিন।

রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও ক্রিকেটীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা অবশ্য থেমে থাকেনি। বরং বছরের শুরুতে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কে যে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছিল, ভারত সিরিজটিকে তা কাটিয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

সিরিজটি নিয়ে বিসিবি ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। গত মাসে স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসির সভায় আইসিসি সভাপতি জয় শাহ এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের ইতিবাচক আলোচনা হয়। এরপর দুবাইয়ে আইসিসি ফ্র্যাঞ্চাইজি কমিটির একটি সভার সময়ও ভারতীয় বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে। এর বাইরে তামিম ইকবালের সাম্প্রতিক ভারত সফরও সিরিজ আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছিল।

বিসিবির জন্য এই সিরিজের গুরুত্ব কেবল ক্রিকেটীয় নয়, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকেও যথেষ্ট। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিকেট বাজার হওয়ায় দেশটির জাতীয় দলের সফর আয়োজক দেশের জন্য সম্প্রচারস্বত্ব, পৃষ্ঠপোষকতা, টিকিট বিক্রি, বিজ্ঞাপন এবং দর্শক আগ্রহের দিক থেকে বড় সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশে ভারতীয় দলের ম্যাচ হলে মাঠে দর্শকের উপস্থিতি এবং টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমে দর্শকসংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখন সেই সম্ভাবনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ভারতীয় দলের সফরের জন্য নিরাপত্তা, ভেন্যু প্রস্তুতি, আবাসন, যাতায়াত এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দুই দেশের সরকারের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ভারতীয় দলের বাংলাদেশে আসার তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

তারপরও বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিজ বাতিলের পথে যায়নি। সংস্থাটির একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি কঠিন হলেও বোর্ড সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, সিরিজ আর হবে না—এমন চূড়ান্ত পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। তবে হাতে সময় খুব কম।

ফলে আগামী কয়েক দিনই সিরিজটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে শেষ মুহূর্তেও পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফর সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘদিনের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বিসিবির প্রত্যাশিত বড় একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনও অনিশ্চয়তায় পড়ে যেতে পারে।

মন্তব্য করুন