ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যকার প্রথম টেস্ট ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে এখন উইকেট। প্রায় ২৩ বছর পর এই ভেন্যুতে ফিরছে টেস্ট ক্রিকেট। তাই ম্যাচ শুরুর আগেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে—মারারার পিচে ব্যাটসম্যানরা কতটা স্বচ্ছন্দে রান করতে পারবেন, নতুন বলে পেসাররা কতটা সহায়তা পাবেন এবং ম্যাচ গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উইকেটের আচরণ কতটা বদলাবে।
মারারা স্টেডিয়ামে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি টেস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ টেস্টটি হয়েছিল ২০০৩ সালে, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া। দীর্ঘ বিরতির পর একই মাঠে আবার দুই দল মুখোমুখি হওয়ায় আগের স্মৃতিও ফিরে এসেছে। ওই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ব্যবধানে জয় পেয়েছিল। এর আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও একই মাঠে জয় পেয়েছিল স্বাগতিকরা। ফলে ভেন্যুটিতে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট রেকর্ড এখন পর্যন্ত নিখুঁত।
ম্যাচের আগে উইকেটের চরিত্র নিয়ে কথা বলেছেন মারারা স্টেডিয়ামের প্রধান কিউরেটর জ্যাক পাভলিচ। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, কোনো নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দেওয়ার মতো পিচ তৈরির পরিকল্পনা নেই। বরং এমন একটি উইকেট প্রস্তুত করাই তাঁদের লক্ষ্য, যেখানে ব্যাটসম্যানরা শট খেলে রান করার সুযোগ পাবেন এবং বোলারদেরও ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতার মাধ্যমে উইকেট আদায় করতে হবে।
পাভলিচের মতে, উইকেট নিয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন নেই। পাঁচ দিনের টেস্ট ক্রিকেটের উপযোগী একটি ধারাবাহিক পিচই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। অর্থাৎ ম্যাচের শুরু থেকেই অস্বাভাবিক আচরণ করা কিংবা কেবল পেসার অথবা ব্যাটসম্যানদের জন্য একতরফা সুবিধা তৈরি করা হবে না।
তবে ম্যাচের দিন যত এগোবে, উইকেটের চরিত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। পাভলিচের ধারণা, চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে ব্যাটিং তুলনামূলক কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রথম দুই দিনে ব্যাটসম্যানরা ভালো রান করার সুযোগ পেলেও শেষ দিকে বোলারদের জন্য বাড়তি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। টেস্ট ক্রিকেটের প্রচলিত চ্যালেঞ্জের সঙ্গে এই ধরনের পরিবর্তনই স্বাভাবিকভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অস্ট্রেলিয়ার পিচ বলতেই সাধারণত গতি ও বাউন্সের কথা মনে আসে। কিন্তু পাভলিচ মনে করিয়ে দিয়েছেন, দেশের সব অঞ্চলের উইকেট একই ধরনের নয়। স্থানীয় আবহাওয়া, মাটি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং মাঠের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে অস্ট্রেলিয়ার এক ভেন্যুর সঙ্গে অন্য ভেন্যুর পিচের আচরণে পার্থক্য থাকতেই পারে।
তাঁর দৃষ্টিতে ‘আদর্শ অস্ট্রেলিয়ান পিচ’ বলে একটি নির্দিষ্ট ধরন নির্ধারণ করাও সহজ নয়। মারারায় তাঁর প্রত্যাশা, ব্যাটসম্যানরা স্বচ্ছন্দে রান করার সুযোগ পাবেন, কিন্তু বোলাররা সঠিক জায়গায় বল করতে পারলে সাফল্যও পাবেন। অর্থাৎ কেবল উইকেটের সহায়তার ওপর নির্ভর না করে বোলারদের নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে হবে।
সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়ান টেস্ট ক্রিকেটে দ্রুত ম্যাচ শেষ হওয়ার কিছু নজির থাকায় এই বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সর্বশেষ অ্যাশেজ সিরিজে পার্থ ও মেলবোর্নের টেস্ট মাত্র দুই দিনেই শেষ হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই তাই প্রশ্ন উঠছে, ডারউইনের টেস্টও কি একই পথে হাঁটবে?
কিউরেটর অবশ্য এমন কোনো পরিণতি চান না। তাঁর প্রত্যাশা, মারারার উইকেট এমন হবে যাতে ম্যাচ দীর্ঘ সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ থাকে এবং দুই দলই নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ পায়। যদিও একটি টেস্ট কত দিনে শেষ হবে, তা শেষ পর্যন্ত কিউরেটরের হাতে থাকে না। পিচ প্রস্তুত করার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ক্রিকেটারদের হাতে।
বাংলাদেশের জন্য এই ম্যাচে উইকেটের চরিত্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে পেস, বাউন্স ও নতুন বলে সুইং সামলে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করা সফরকারীদের জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পেসারদেরও স্থানীয় পরিবেশের সুবিধা কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে ফেলতে হবে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া নিজেদের ঘরের কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে। মারারার আগের দুই টেস্টে তাদের সাফল্যও স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে মারারা স্টেডিয়ামের পিচ নিয়ে এখন পর্যন্ত যে বার্তা পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো—এটি কোনো একপক্ষের জন্য তৈরি উইকেট নয়। ব্যাটসম্যানদের রান করার সুযোগ থাকবে, আবার বোলারদেরও ধৈর্য ও নিখুঁত বোলিংয়ের পুরস্কার মিলবে। শেষ পর্যন্ত এই ভারসাম্য কতটা বাস্তব রূপ নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গল্প।