ভারতীয় ক্রিকেটে প্রতিভাবান তরুণের আবির্ভাব নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে বৈভব সূর্যবংশীর উত্থানের গতি তাঁকে অন্য অনেক কিশোর ক্রিকেটারের তুলনায় আলাদা করে তুলেছে। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের জার্সি পরার সুযোগ এবং ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে নজরকাড়া পারফরম্যান্স তাঁকে রাতারাতি ক্রিকেটপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। মাঠের সাফল্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তাঁর জনপ্রিয়তা। আর সেই জনপ্রিয়তার প্রভাব এখন স্পষ্ট হচ্ছে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও।
রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে আইপিএলে ব্যাট হাতে কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন ইনিংস খেলার পর থেকেই বৈভবকে ঘিরে আগ্রহ দ্রুত বাড়তে থাকে। বয়সে কিশোর হলেও তাঁর ব্যাটিংয়ে পরিণত ভাব, আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং বড় মঞ্চে আত্মবিশ্বাস ক্রিকেটবিশ্বের নজর কেড়েছে। তরুণ এই ক্রিকেটারের জনপ্রিয়তা শুধু দর্শক ও সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন পণ্য ও সেবার প্রচারণার জন্যও তিনি আকর্ষণীয় মুখ হয়ে উঠেছেন।
বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৈভব ইতোমধ্যে অন্তত পাঁচটি বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত হয়েছেন। একটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে তাঁর পারিশ্রমিক এক কোটি রুপির বেশি হতে পারে বলেও কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব চুক্তির প্রকৃত আর্থিক মূল্য সব ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে না আসায় নির্দিষ্ট অঙ্ককে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
একইভাবে বৈভবের মোট সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন ধরনের হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকটি প্রতিবেদনে তাঁর আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ৭ থেকে ১০ কোটি রুপির মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সম্ভাব্য সম্পদের উৎস হিসেবে আইপিএলের পারিশ্রমিক, ম্যাচ ফি, ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে আয় এবং বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতা চুক্তির কথা বলা হয়েছে। তবে এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হিসাব নয়; প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা আনুমানিক মূল্যায়ন।
বৈভবের বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে ক্রিকেট সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসএস-এর নাম রয়েছে। সারিন স্পোর্টসের এই ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাঁর বছরে প্রায় ৫০ লাখ রুপির সরঞ্জাম চুক্তির কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শুধু ক্রিকেট সরঞ্জাম সরবরাহের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি। বৈভবকে ঘিরে বিশেষ সংস্করণের ব্যাট বাজারে আনার উদ্যোগের কথাও জানা গেছে। এত অল্প বয়সী একজন ক্রিকেটারের নামে ক্রিকেট সরঞ্জাম বাজারজাত করার আগ্রহ তাঁর বাণিজ্যিক গ্রহণযোগ্যতারই ইঙ্গিত দেয়।
পুষ্টি পানীয় ব্র্যান্ড কমপ্ল্যানও বৈভবকে নিজেদের প্রচারণায় যুক্ত করেছে। কিশোর বয়সী খেলোয়াড়দের পুষ্টি, অনুশীলন ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে তাঁর ক্রিকেটীয় পরিচিতিকে যুক্ত করা হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বৈভবের পরিচিতি এই ধরনের প্রচারণায় ব্র্যান্ডটির জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করছে।
প্রযুক্তি খাতেও তাঁর উপস্থিতি দেখা গেছে। গুগলের অর্থ লেনদেনসেবা গুগল পের একটি প্রচারণায় বৈভবকে ব্যবহার করা হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেন, প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং তরুণদের মধ্যে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে তাঁর জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানো হয়েছে।
শক্তিবর্ধক পানীয় ব্র্যান্ড রেড বুলের সঙ্গেও বৈভবের সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। আইপিএলের সময় রাজস্থান রয়্যালসের সতীর্থ ধ্রুব জুরেলের সঙ্গে একটি প্রচারণামূলক চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে ৩০ বলে ৬০ রানের ইনিংস খেলে বৈভব নিজের ব্যাটিং সামর্থ্যের পাশাপাশি ওই প্রচারণাকেও আলোচনায় নিয়ে আসেন। মাঠের পারফরম্যান্সকে বিপণন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার এই ধরনের উদ্যোগ তাঁর বাণিজ্যিক পরিচিতি আরও বাড়িয়েছে।
তাঁর জনপ্রিয়তার ব্যবহার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তরুণদের স্বাস্থ্য ও ফিটনেসের প্রতি উৎসাহিত করার একটি উদ্যোগে ঝাড়খণ্ডের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত মে মাসে বৈভবকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করার ঘোষণা দিয়েছে বলেও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন কিশোর ক্রিকেটারের পরিচিতিকে জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে কাজে লাগানোর দিক থেকেও বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
তবে অল্প বয়সে ক্রিকেটীয় সাফল্যের পাশাপাশি খ্যাতি, অর্থ ও বিজ্ঞাপনের সুযোগ পাওয়া সবসময় নিছক সুবিধা নয়। এর সঙ্গে আসে বাড়তি প্রত্যাশা এবং চাপ। বৈভবের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর বয়স এখনও কৈশোরের পর্যায়ে। অতিরিক্ত প্রচারণা, বিজ্ঞাপনী কার্যক্রম কিংবা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যস্ততা যেন তাঁর অনুশীলন, ক্রিকেটীয় দক্ষতার উন্নয়ন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেটিই বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
ক্রিকেটে প্রতিভা দেখানো এবং দীর্ঘদিন শীর্ষ পর্যায়ে টিকে থাকা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরীক্ষা। বৈভব ইতোমধ্যে প্রথম ধাপের কঠিন কিছু দরজা খুলে ফেলেছেন। এখন তাঁর সামনে ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। বয়স যত বাড়বে, প্রতিপক্ষের প্রস্তুতি তত উন্নত হবে এবং তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশাও বাড়তে থাকবে। সেই পরিস্থিতিতে কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা ও চাপ সামলানোর ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও আইপিএলের মতো বড় মঞ্চে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া নিঃসন্দেহে বিরল অর্জন। একই সময়ে তাঁর ঘিরে যে বাণিজ্যিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেটিও ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর দ্রুত উত্থানের আরেকটি দিক তুলে ধরে। তবে বিজ্ঞাপনী মূল্য বা সম্পদের হিসাবের চেয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর ক্রিকেটীয় পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে বৈভব সূর্যবংশীর পরিচিতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
এই মুহূর্তে তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত কিশোর প্রতিভাদের একজন। তাঁর সামনে সুযোগ যেমন অনেক, তেমনই প্রত্যাশার চাপও কম নয়। সেই চাপ সামলে যদি ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করতে পারেন, তবে আজকের বিস্ময়কর কিশোর প্রতিভা আগামী দিনের প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারে পরিণত হতে পারেন। তবে সেই উত্তর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে সময়ের।