রাজাউল্লাহর পাসপোর্ট নিয়ে ভাইরাল দাবি কতটা সত্য

ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তানের একের পর এক ব্যর্থতার মধ্যে টেস্ট দলে বড় পরিবর্তন আনা হয়। সেই পরিবর্তনের সুযোগেই প্রথমবারের মতো জাতীয় টেস্ট দলে জায়গা পান ২২ বছর বয়সী পেস বোলিং অলরাউন্ডার রাজাউল্লাহ। অভিষেকেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে তিনি ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর কাড়েন। তবে মাঠের কৃতিত্বের পাশাপাশি তাঁকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি গল্পও বেশ আলোচনার জন্ম দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি পোস্টে দাবি করা হয়, ইংল্যান্ড সফরের দলে ডাক পাওয়ার সময় রাজাউল্লাহর কোনো বৈধ পাসপোর্ট ছিল না। তাঁর বাড়ি পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় সেখানে যোগাযোগ করাও কঠিন ছিল বলে দাবি করা হয়। এমনকি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) কর্মকর্তাদের নাকি তাঁকে খুঁজে বের করতে হয়েছিল। এরপর জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট তৈরি করে তাঁকে ইংল্যান্ডগামী বিমানে তুলে দেওয়া হয়—এমন চাঞ্চল্যকর বর্ণনাও পাওয়া যায় ভাইরাল পোস্টগুলোতে।

বিষয়টি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। যাচাই ছাড়াই আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও এই গল্প প্রকাশিত হয়। গালফ নিউজসহ কয়েকটি গণমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর রাজাউল্লাহর পাসপোর্ট-সংক্রান্ত গল্প আরও ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু টেস্ট অভিষেকের পর সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে নিজেই সেই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন রাজাউল্লাহ। তাঁর ভাষ্য, পাসপোর্ট না থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

এজবাস্টন টেস্টের পর রাজাউল্লাহ বলেন, ‘পাসপোর্ট না থাকার খবরটি পুরোপুরি মিথ্যা। ইংল্যান্ড সফরের দল ঘোষণার প্রায় এক বছর আগেই আমার বৈধ পাসপোর্ট ছিল।’

তাঁর এই বক্তব্যের ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গল্পটির সত্যতা নিয়ে স্পষ্ট প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড সফরের আগে হঠাৎ করে তাঁর পাসপোর্ট তৈরি করা হয়েছিল—এমন দাবির সঙ্গে রাজাউল্লাহর নিজের বক্তব্যের কোনো মিল নেই। একইভাবে তাঁকে খুঁজে বের করার যে গল্প ছড়িয়েছে, সেটিও তিনি সমর্থন করেননি।

তবে বিতর্কের চেয়ে রাজাউল্লাহর মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এজবাস্টনে অভিষেক টেস্টে বল হাতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন তিনি। ঘণ্টায় ১৪৮ কিলোমিটারের বেশি গতিতে বোলিং করে প্রথম স্পেলেই ইংল্যান্ডের অধিনায়ক জো রুটকে আউট করেন এই তরুণ পেসার। তাঁর মাত্র চতুর্থ ডেলিভারিতেই রুটের উইকেট আসে।

অভিষেকের প্রথম ম্যাচে এমন গতিময় বোলিং স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তান দলের জন্য আশার বার্তা হয়ে ওঠে। তবে রাজাউল্লাহর আসল চমক ছিল ব্যাট হাতে।

পাকিস্তান যখন ইনিংস পরাজয়ের শঙ্কায়, তখন ৯ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন তিনি। মাত্র ৬৩ বলে করেন ৮১ রান। তাঁর ইনিংসে ছিল নয়টি ছক্কা। দলের বিপর্যয়ের মধ্যে এমন আগ্রাসী ব্যাটিং শুধু পাকিস্তানের স্কোরই বাড়ায়নি, অভিষেক ম্যাচেই তাঁকে রেকর্ডের আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

টেস্ট অভিষেকে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ নয়টি ছক্কা মারার কৃতিত্বে নিউজিল্যান্ডের টিম সাউদির সঙ্গে যৌথভাবে জায়গা করে নেন রাজাউল্লাহ। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের মাটিতে এক টেস্ট ইনিংসে নয়টি ছক্কার রেকর্ডেও ইংল্যান্ডের অধিনায়ক বেন স্টোকসের সঙ্গে যৌথভাবে নাম লেখান তিনি।

ফলে রাজাউল্লাহর টেস্ট অভিষেকের গল্পে দুটি আলাদা দিক সামনে এসেছে। একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পাসপোর্টের গল্প, যা তিনি সরাসরি মিথ্যা বলেছেন। অন্যটি তাঁর অসাধারণ ক্রিকেটীয় পারফরম্যান্স, যা কোনো প্রচার বা অতিরঞ্জনের ওপর নির্ভর করছে না।

বল হাতে ১৪৮ কিলোমিটারের বেশি গতি, অভিষেকেই জো রুটের মতো ব্যাটসম্যানের উইকেট এবং এরপর ৬৩ বলে ৮১ রানের বিস্ফোরক ইনিংস—সব মিলিয়ে রাজাউল্লাহ নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছেন মাঠেই। বিশেষ করে নয়টি ছক্কার ইনিংসটি তাঁকে অভিষেক ম্যাচেই রেকর্ডের পাতায় নিয়ে গেছে।

পাকিস্তানের টেস্ট দলে জায়গা ধরে রাখতে অবশ্য একটি ম্যাচের পারফরম্যান্স যথেষ্ট নয়। নতুন এই অলরাউন্ডারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। তবে অভিষেকেই তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তাতে পাকিস্তানের টেস্ট দলে ভবিষ্যতের জন্য তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।

রাজাউল্লাহর ক্ষেত্রে তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাইরাল গল্পের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাঁর ব্যাট-বলের পারফরম্যান্স। পাসপোর্ট নিয়ে ছড়ানো বিতর্ক তিনি নিজেই খারিজ করেছেন; আর মাঠে নিজের পরিচয় দিয়েছেন রেকর্ড গড়ে।

মন্তব্য করুন