ক্রিকেটে একটি দলের জন্য স্বস্তির মুহূর্ত কখনো কখনো অন্য দলের জন্য বড় হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এজবাস্টন টেস্টের তৃতীয় দিনে তেমনই এক অদ্ভুত পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে। পাকিস্তান যখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ইনিংস হার এড়ানোর লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে নেমে রাজাউল্লাহর দুর্দান্ত ৮১ রানের ইনিংস ম্যাচের গতিপথই বদলে দেয়। আর সেই ইনিংসের কারণেই নির্ধারিত ফ্লাইট ধরতে পারেননি পাকিস্তানের ওপেনার সাইম আইয়ুব। এর প্রভাব গিয়ে পড়ে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (সিপিএল) দল জ্যামাইকা কিংসম্যানের ওপর।
সাইম তখন সিপিএলে জ্যামাইকা কিংসম্যানের হয়ে খেলছিলেন এবং ব্যাট হাতে ছিলেন দারুণ ছন্দে। টুর্নামেন্টে তিন ইনিংসে একটি সেঞ্চুরিসহ তাঁর সংগ্রহ ছিল ১২৭ রান। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে তাঁকে দলে পাওয়াটা জ্যামাইকার জন্য ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সাইমকে দ্রুত ক্যারিবিয়ানে ফেরাতে দলটির পক্ষ থেকে আগেই ভ্রমণ পরিকল্পনাও করা হয়েছিল।
পরিকল্পনাটি ছিল সহজ। ধারণা করা হয়েছিল, এজবাস্টন টেস্টের তৃতীয় দিনেই ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়ে যেতে পারে। সেই হিসাব করেই শুক্রবারের একটি ফ্লাইটে সাইমের টিকিট কেটে রাখা হয়েছিল। টেস্ট শেষ হওয়ার পরপরই যেন তিনি ইংল্যান্ড থেকে ক্যারিবিয়ানের উদ্দেশে রওনা হতে পারেন, সে অনুযায়ী সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) কাছ থেকেও সহযোগিতা পেয়েছিল জ্যামাইকা। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সাইমকে দ্রুত দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিতে পিসিবির কাছে অনুরোধ করা হয়েছিল। বোর্ডও তাতে সম্মতি দিয়েছিল।
জ্যামাইকার এই হিসাবের পেছনে যথেষ্ট যুক্তিও ছিল। এজবাস্টনে প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের চেয়ে ৩২০ রানে পিছিয়ে পড়েছিল পাকিস্তান। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় দিন শেষে মাত্র ৫২ রান তুলতেই হারিয়েছিল দুই উইকেট। ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় তৃতীয় দিনেই পাকিস্তানের ইনিংস শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি মনে হচ্ছিল।
কিন্তু ক্রিকেটের চিত্র বদলে যেতে বেশি সময় লাগে না।
তৃতীয় দিনের শেষ বিকেলে পাকিস্তানের নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে মাঠে নামেন রাজাউল্লাহ। দল তখনও বড় বিপদের মধ্যে। ইনিংস হার এড়াতে প্রয়োজন ছিল গুরুত্বপূর্ণ রান এবং উইকেটে টিকে থাকার মতো দৃঢ়তা। সেই জায়গা থেকেই মোহাম্মদ আব্বাসকে সঙ্গে নিয়ে রাজাউল্লাহ শুরু করেন দুর্দান্ত প্রতিরোধ।
নবম উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ১২১ রানের জুটি। মাত্র ১২৩ বলে গড়া এই জুটি পাকিস্তানকে বড় বিপদ থেকে টেনে তোলে। আব্বাস ৪২ রান করে ফিরে গেলেও রাজাউল্লাহ থামেননি। ফিফটি পূর্ণ করার পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি। ইংল্যান্ডের বোলারদের ওপর পাল্টা চাপ তৈরি করে দ্রুত রান তুলতে থাকেন।
শেষ উইকেটে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে রাজাউল্লাহ যোগ করেন আরও ১০ রান। দিনের শেষ ওভারে তাঁর ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে। তবে তার আগেই তিনি নিজের নামের পাশে তুলে নেন ৬৩ বলে ৮১ রানের ঝড়ো ইনিংস। তাঁর ব্যাটিংয়ের সুবাদে পাকিস্তানের লিড দাঁড়ায় ১২৯ রানে। ফলে যে ম্যাচটি তৃতীয় দিনেই শেষ হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল, সেটি গড়ায় চতুর্থ দিনে।
আর এই অতিরিক্ত এক দিনই পাল্টে দেয় সাইম আইয়ুবের পুরো ভ্রমণ পরিকল্পনা।
টেস্ট চতুর্থ দিনে গড়ানোয় শুক্রবারের নির্ধারিত ফ্লাইটে সাইমের ওঠার সুযোগ আর থাকেনি। অথচ শনিবার রাতে ব্রিজটাউনে বার্বাডোজ ট্রাইডেন্টসের বিপক্ষে জ্যামাইকা কিংসম্যানের ম্যাচ ছিল। প্লে-অফের দৌড়ে টিকে থাকার জন্য ম্যাচটি ছিল তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিপিএলে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা সাইমকে সেই ম্যাচে পাওয়ার বিষয়টি তাই জ্যামাইকার জন্য বাড়তি গুরুত্ব বহন করছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ে বার্বাডোজে পৌঁছাতে না পারায় সাইমকে ছাড়াই ম্যাচে নামতে হয় জ্যামাইকাকে। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ফলও তাদের পক্ষে যায়নি। বার্বাডোজ ট্রাইডেন্টসের কাছে দুই উইকেটে হেরে যায় জ্যামাইকা কিংসম্যান।
এই পরাজয়ের সঙ্গে প্লে-অফে ওঠার সম্ভাবনাও শেষ হয়ে যায় জ্যামাইকার। অর্থাৎ এজবাস্টনে রাজাউল্লাহর ব্যাটিং পাকিস্তানকে যেমন বড় বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিল, সেই একই ইনিংসের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গিয়ে পড়ে হাজার মাইল দূরের ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটে।
ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, রাজাউল্লাহ সম্ভবত জানতেনও না তাঁর ৮১ রানের ইনিংসের প্রভাব এজবাস্টনের সীমানা ছাড়িয়ে সিপিএলের একটি ম্যাচের ফলাফলেও পড়তে যাচ্ছে। পাকিস্তানের জন্য তাঁর লড়াই ছিল স্বস্তির বার্তা। বিপরীতে, সেই লড়াইয়ের কারণেই সাইম আইয়ুবের ভ্রমণ পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং জ্যামাইকা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাদের ছন্দে থাকা ব্যাটসম্যানকে পায়নি।
ক্রিকেটে ম্যাচের ফল কেবল মাঠের ২২ গজেই নির্ধারিত হয় না—কখনো কখনো একটি বাউন্ডারি, একটি জুটি কিংবা একজন ব্যাটসম্যানের কয়েকটি অতিরিক্ত রান মাঠের বাইরের ঘটনাকেও প্রভাবিত করে। এজবাস্টনের তৃতীয় দিনের ঘটনাটি তারই মজার উদাহরণ।
একটি টেস্ট ম্যাচ দ্রুত শেষ হবে—এই অনুমানের ভিত্তিতে করা ভ্রমণ পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেল লোয়ার অর্ডারের এক ব্যাটসম্যানের অসাধারণ প্রতিরোধে। রাজাউল্লাহর ৮১ রান পাকিস্তানকে বাঁচার সুযোগ করে দিল, সাইমের ফ্লাইট মিস হলো, আর জ্যামাইকা কিংসম্যান হারল গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। একই ব্যাটিং তাই এক দলের জন্য হয়ে উঠল আশীর্বাদ, অন্য দলের জন্য দুর্ভাগ্যের কারণ।