ইংল্যান্ড সফরটা ব্যাট হাতে মোটেও ভালো কাটেনি পাকিস্তানের টেস্ট অধিনায়ক বাবর আজমের। সিরিজের শেষ টেস্টে এজবাস্টনে দ্বিতীয় ইনিংসে কিছুটা দৃঢ়তার পরিচয় দিলেও তার আগের তিন ইনিংসে রান ছিল মাত্র ৮, ৬ ও ৭। ফলে ব্যক্তিগত ব্যর্থতার পাশাপাশি দলীয় হতাশাও সঙ্গী হয়েছে তার। এবার সেই হতাশা পেছনে ফেলে ব্যাটিংয়ের পুরোনো ছন্দে ফিরতে ঘরোয়া লাল বলের ক্রিকেটে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পাকিস্তানের তারকা ব্যাটার।
প্রায় সাত বছর পর পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ফিরছেন বাবর। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের পর ঘরোয়া ক্রিকেটের দীর্ঘ সংস্করণে তাকে আর দেখা যায়নি। এবার প্রেসিডেন্টস ট্রফি গ্রেড ওয়ানে অয়েল অ্যান্ড গ্যাস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ওজিডিসিএল) হয়ে খেলবেন তিনি। দলটির হয়ে অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন বাবর।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কায়েদ-ই-আযম ট্রফিতে সেন্ট্রাল পাঞ্জাবের অধিনায়ক হিসেবে সর্বশেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। এরপর পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সূচিতে নিয়মিত ব্যস্ত থাকায় ঘরোয়া লাল বলের ক্রিকেট থেকে দূরে ছিলেন এই ব্যাটার। এখন সেই দীর্ঘ বিরতির পর আবার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) সাম্প্রতিক উদ্যোগও বাবরের এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। জাতীয় দলের প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অংশ নিতে উৎসাহিত করছে বোর্ড। এরই ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্টস কাপে এবার পাকিস্তানের আরও কয়েকজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার খেলছেন।
ওয়ানডে দলের অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি প্রতিনিধিত্ব করছেন কেআরএলকে। টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক সালমান আলী আগা খেলছেন কিংসমেন একাডেমির হয়ে। ফলে প্রেসিডেন্টস ট্রফিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা থাকা খেলোয়াড়দের উপস্থিতি প্রতিযোগিতাটিকে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাবরের দলে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওজিডিসিএলের ক্রীড়া বিভাগের প্রধান ফারাহ। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য থেকে পাকিস্তানে ফেরার কথা বাবরের। পরদিনই দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তার। এরই মধ্যে বাবরের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রিকেট সরঞ্জামও প্রস্তুত করা হয়েছে।
তবে প্রত্যাবর্তনের ম্যাচ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফারাহ জানিয়েছেন, পাকিস্তানে ফেরার পর বাবর ঠিক করবেন তিনি প্রেসিডেন্টস ট্রফির দ্বিতীয় ম্যাচ থেকে খেলবেন, নাকি তৃতীয় ম্যাচে মাঠে নামবেন। অর্থাৎ দীর্ঘ বিরতির পর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার প্রত্যাবর্তনের নির্দিষ্ট ম্যাচটি এখনো ঠিক হয়নি।
বাবরের ঘরোয়া লাল বলের ক্রিকেট থেকে দূরে থাকা নিয়ে পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে তার ব্যাটিংয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকতার অভাব স্পষ্ট। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর টেস্টে আর শতকের দেখা পাননি তিনি। ওই বছর করাচিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র হওয়া টেস্টে ১৬১ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেছিলেন বাবর। সেটিই এখন পর্যন্ত টেস্টে তার সর্বশেষ সেঞ্চুরি।
এরপর টেস্টে তার ব্যাটিং গড়ও নেমে গেছে। ২০২৩ সালের শুরু থেকে টেস্টে বাবরের গড় ৩০.৪৩, যা তার ক্যারিয়ার গড়ের চেয়ে ১২.৫৫ রান কম। পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে তার এই পরিসংখ্যান স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইংল্যান্ড সফর সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথমবারের মতো হোয়াইটওয়াশ হয়েছে পাকিস্তান। লিডস ও লর্ডসে প্রথম দুই টেস্টে পাকিস্তানের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। ব্যাটিংয়ে বড় জুটি কিংবা দীর্ঘ ইনিংসের অভাবে দল বারবার চাপে পড়েছে।
এজবাস্টনে অবশ্য পাকিস্তান আগের দুই ম্যাচের তুলনায় অনেক বেশি লড়াই করেছে। শেষ টেস্টে দলের পারফরম্যান্সে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছাপ ছিল এবং বাবরও দ্বিতীয় ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। কিন্তু পুরো সফরে তার ব্যক্তিগত ব্যাটিং ব্যর্থতা ঢাকার জন্য সেই একটি ইনিংস যথেষ্ট হয়নি।
এখন তাই সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ফিরে বাবর দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকার সুযোগ পাবেন। নতুন বল সামলানো, ধৈর্য ধরে ইনিংস গড়া, পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের ধরন বদলানো—টেস্ট ক্রিকেটের জন্য প্রয়োজনীয় এসব দক্ষতা নিয়মিত লাল বলের ম্যাচে আরও ঝালিয়ে নেওয়া সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘরোয়া ক্রিকেটে তিনি আন্তর্জাতিক ম্যাচের চাপের বাইরে নিজের ব্যাটিং নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাবেন। একটি বড় ইনিংস আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে, আবার নিয়মিত ম্যাচ খেলার মাধ্যমে ছন্দও তৈরি হতে পারে। বাবরের বর্তমান পরিস্থিতিতে দুটিই প্রয়োজন।
পাকিস্তান দলের জন্যও তার ফর্ম ফিরে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বাবর দেশটির ব্যাটিংয়ের অন্যতম প্রধান মুখ। তার ব্যাটে রান থাকলে পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের ওপর চাপ কমে, একই সঙ্গে দলের বড় সংগ্রহ গড়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।
তাই প্রেসিডেন্টস ট্রফিতে বাবরের প্রত্যাবর্তন নিছক ঘরোয়া ক্রিকেটে একজন তারকা খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ নয়। এটি তার ফর্ম পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সাত বছর পর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ফিরে বাবর কতটা দ্রুত নিজেকে মেলে ধরতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সেই পারফরম্যান্সের দিকেই নজর থাকবে পাকিস্তানের ক্রিকেট মহলের।