দুবাইয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে দারুণ শুরুর পর হঠাৎ ব্যাটিং ধসে পড়েছে বাংলাদেশ। উদ্বোধনী জুটিতে ১০৮ রান তুলে বড় সংগ্রহের ভিত তৈরি করেছিল দল। কিন্তু সেই ভিত কাজে লাগাতে পারেনি পরের ব্যাটাররা। একের পর এক উইকেট হারিয়ে শেষ পর্যন্ত ২৩৪ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস।
শুরুটা দেখে অবশ্য এমন পরিণতির কথা ভাবার সুযোগ ছিল না। সৌম্য সরকার ও সাদমান ইসলাম সাবলীল ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশকে দ্রুত এগিয়ে নেন। দুজনের ব্যাটে রান আসছিল স্বচ্ছন্দে, উইকেটেও ছিল যথেষ্ট স্থিরতা। উদ্বোধনী জুটি শতরান পার করার পর বাংলাদেশের স্কোর ৩০০ কিংবা তারও বেশি হতে পারে—এমন প্রত্যাশাই তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু ১০৮ রানে প্রথম উইকেট পড়ার পর বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আর সেই ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকায় বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা ক্রমেই কমে আসে। এক পর্যায়ে মাত্র ৭৪ রানের ব্যবধানে ছয় উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
সৌম্য সরকারই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৫৭ রান। শুরুতে সাদমানের সঙ্গে তাঁর ১০৮ রানের জুটিই ইনিংসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। তবে এই জুটি ভেঙে যাওয়ার পর আর কোনো ব্যাটিং জুটি দলকে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে নিতে পারেনি।
তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামা মুমিনুল হক কিছুটা সময় উইকেটে কাটান। ৬৩ বলে ৩৩ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার চেষ্টা, কিন্তু অপর প্রান্তে দ্রুত উইকেট পড়ায় সেই প্রতিরোধ দীর্ঘ হয়নি। মুশফিকুর রহিম মাত্র ৪ রান করে ফিরে যান। জাকের আলীর ব্যাট থেকে আসে ৮ রান।
অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজও ব্যাট হাতে দলকে খুব বেশি সময় দিতে পারেননি। তিনি করেন ৮ রান। ফলে শুরুর ১০৮ রানের ভিত্তি আর বড় সংগ্রহে রূপ নেয়নি। বাংলাদেশের টপ ও মিডল অর্ডারের এই ব্যর্থতাই শেষ পর্যন্ত ইনিংসের গতি থামিয়ে দেয়।
লোয়ার অর্ডারে নাঈম হাসান কিছুটা লড়াই করেছেন। তাঁর ৩৬ রান বাংলাদেশের স্কোরকে দুইশ ছাড়িয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাইজুল ইসলাম করেন ১৬ রান। শেষ দিকে তাদের ব্যাটিংয়ের সুবাদেই ২৩৪ পর্যন্ত যেতে পারে বাংলাদেশ। না হলে ইনিংস আরও কম রানে থেমে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
আমিরাতের বোলারদের মধ্যে জুনাইদ সবচেয়ে সফল। তিনি নিয়েছেন তিনটি উইকেট। উসাইদ ও হায়দার আলী পেয়েছেন দুটি করে উইকেট। বাংলাদেশের উদ্বোধনী জুটি যতক্ষণ উইকেটে ছিল, আমিরাতের বোলারদের ওপর ততটা চাপ তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ। কিন্তু জুটি ভাঙার পর দ্রুত উইকেট পাওয়ায় স্বাগতিক বোলাররা ম্যাচে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নেন।
বাংলাদেশের ২৩৪ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে আরব আমিরাতও শুরুতেই একটি উইকেট হারায়। দলীয় ২৪ রানের সময় লুকমানকে ফিরিয়ে দেন বাংলাদেশের পেসার খালেদ আহমেদ। এরপর অবশ্য আর কোনো উইকেট হারায়নি স্বাগতিকরা।
দিনের খেলা শেষ হওয়ার সময় আরব আমিরাতের স্কোর ১ উইকেটে ৩৪ রান। বাংলাদেশের ২৩৪ রানের তুলনায় তারা পিছিয়ে ২০০ রানে। হাতে এখনো নয়টি উইকেট থাকায় স্বাগতিকদের সামনে প্রথম লক্ষ্য হবে ব্যবধান কমানো এবং বাংলাদেশের স্কোরের যতটা সম্ভব কাছাকাছি পৌঁছানো।
বাংলাদেশের জন্য অবশ্য এই প্রস্তুতি ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এসেছে ব্যাটিং থেকেই। প্রস্তুতি ম্যাচে ফলাফল সবসময় মূল বিষয় নয়; বরং দলের প্রস্তুতির ঘাটতি ও শক্তির জায়গাগুলো চিহ্নিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। সেই বিচারে ১০৮ রানের উদ্বোধনী জুটি ইতিবাচক দিক হলেও, এরপর মাত্র ১২৬ রানে পুরো দল গুটিয়ে যাওয়া চিন্তার কারণ।
বিশেষ করে মাঝের সারির ব্যাটারদের ব্যর্থতা আলাদা করে নজরে পড়েছে। একজন বা দুজন ব্যাটার সেট হওয়ার পর ইনিংস বড় করতে পারলে বাংলাদেশের স্কোরের চেহারা অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু দ্রুত উইকেট হারানোর কারণে চাপ চলে যায় পরের ব্যাটারদের ওপর। লোয়ার অর্ডারের কয়েকজন সেই চাপ সামলে কিছু রান যোগ করলেও ততক্ষণে বড় সংগ্রহের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে।
এখন বাংলাদেশের বোলারদের সামনে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ। ২৩৪ রান খুব বড় স্কোর নয়। তাই আমিরাতকে দ্রুত অলআউট করতে পারলে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসেই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। অন্যদিকে স্বাগতিক ব্যাটাররা যদি দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতার চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
দুবাইয়ের এই প্রস্তুতি ম্যাচে তাই বাংলাদেশের জন্য মূল পরীক্ষা শুধু ২৩৪ রান নয়। শুরুতে পাওয়া সুযোগকে কীভাবে শেষ পর্যন্ত কাজে লাগাতে হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১০৮ রানের উদ্বোধনী জুটি যে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিল, পরের ইনিংসগুলোতে সেই সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গ ব্যাটিং পারফরম্যান্সে রূপ দেওয়াই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ।