ভারতের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ইতিহাস গড়েছেন মিজোরামের ব্যাটার চিন্ময় সুতার। নাগাল্যান্ডের বিপক্ষে রঞ্জি ট্রফির প্লেট গ্রুপের ম্যাচে অপরাজিত ৪০০ রান করে অনন্য এক অর্জনের মালিক হয়েছেন ২৯ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। রঞ্জি ট্রফির ৭৭ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে এক ইনিংসে ৪০০ বা তার বেশি রান করা দ্বিতীয় ভারতীয় ব্যাটার তিনি।
নাগাল্যান্ডের সোভিমায় অনুষ্ঠিত ম্যাচের দ্বিতীয় দিনে এই কীর্তি গড়েন সুতার। তাঁর অসাধারণ ব্যাটিংয়ে ভর করে প্রথম ইনিংসে ৯ উইকেটে ৫৮১ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে মিজোরাম। ১৫৫তম ওভারে ৪০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন এই ডানহাতি ব্যাটার। পুরো ইনিংসে তিনি খেলেছেন ৫১৭ বল। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৪৬টি চার ও সাতটি ছক্কা।
সুতারের এই ইনিংস রঞ্জি ট্রফির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ। এর মধ্য দিয়ে তিনি পৃথ্বী শয়ের ৩৭৯ রানের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন। তবে প্রতিযোগিতাটির সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড এখনো অক্ষত রয়েছে। মহারাষ্ট্রের ব্যাটার ভাউসাহেব নিম্বালকর ১৯৪৮-৪৯ মৌসুমে কাথিয়াওয়াড়ের বিপক্ষে অপরাজিত ৪৪৩ রান করেছিলেন। দীর্ঘ ৭৭ বছরের বেশি সময় ধরে সেই রেকর্ড টিকে আছে।
শেষ উইকেটের জুটিতে বড় অবদান
সুতারের ইনিংসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল দশম উইকেটে তাঁর ব্যাটিং। শেষ উইকেটের জুটি গড়ার সময় তিনি ২৩১ রানে অপরাজিত ছিলেন। তখন মিজোরামের সংগ্রহ ছিল ৩৯২ রান। দলের ইনিংস বড় করার দায়িত্ব নিয়ে ক্রিজে আসেন লালরেমপুইয়া ছাকছুয়াক।
দুজন মিলে দশম উইকেটে প্রায় ১৯০ রান যোগ করেন। এই জুটিতে সুতারের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। অন্য প্রান্তে ছাকছুয়াক ১৪ রানে অপরাজিত থাকেন। তাঁদের এই প্রতিরোধের ফলে মিজোরাম ৫০০ রানের গণ্ডি পেরিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ৫৮১ রানে ইনিংস ঘোষণা করার মতো অবস্থানে পৌঁছায়।
শেষ উইকেটে এত বড় জুটি গড়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সব সময়ই কঠিন। কারণ, এ পর্যায়ে ব্যাটিং দলের হাতে আর কোনো স্বীকৃত ব্যাটার অবশিষ্ট থাকেন না। ফলে এক প্রান্ত ধরে রেখে রান বাড়ানোর দায়িত্ব সাধারণত সেট ব্যাটারের ওপরই বর্তায়। সুতারের ইনিংস সেই কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁর ধৈর্য, মনোযোগ ও বড় রান করার সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছে।
নিম্বালকরের রেকর্ড এখনো অক্ষত
ভারতের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এক ইনিংসে ৪০০ বা তার বেশি রান করার নজির অত্যন্ত বিরল। সুতারের আগে ভারতীয় ব্যাটারদের মধ্যে একমাত্র নিম্বালকরই এই কীর্তি গড়েছিলেন। ১৯৪৮-৪৯ মৌসুমে মহারাষ্ট্রের হয়ে কাথিয়াওয়াড়ের বিপক্ষে তাঁর অপরাজিত ৪৪৩ রানের ইনিংসটি রঞ্জি ট্রফির সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ হিসেবে পরিচিত।
সুতার ৪০০ রানে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর আবারও ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন একটি মাইলফলক দেখা গেল। পৃথ্বী শয়ের ৩৭৯ রানের ইনিংস ছাড়িয়ে গেলেও নিম্বালকরের রেকর্ড ভাঙতে পারেননি তিনি। তবে রঞ্জি ট্রফির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস খেলার কৃতিত্ব তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
মুম্বাই থেকে মিজোরাম, নতুন অধ্যায়ের শুরু
চিন্ময় সুতারের ক্রিকেটজীবনে মিজোরামে যোগ দেওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এর আগে তিনি বিজয় হাজারে ট্রফিতে মুম্বাইয়ের হয়ে খেলেছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটের পাশাপাশি ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতাতেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এই ব্যাটার।
২০২৬ সালের জুনে এমএসসি মারাঠা রয়্যালস মুম্বাই টি-টোয়েন্টি লিগের শিরোপা ধরে রাখে। সেই দলের সদস্য ছিলেন সুতার। টুর্নামেন্টে ছয় ইনিংসে ২১২ রান করেন তিনি। প্রতিযোগিতার শেষ দিকে টানা দুটি অর্ধশতকও তুলে নেন, যা তাঁর ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতার পরিচয় দেয়।
২০২৬-২৭ মৌসুমের ঘরোয়া ক্রিকেট শুরুর আগে মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নিয়ে মিজোরামে যোগ দেন তিনি। নতুন দলের হয়ে রঞ্জি ট্রফিতে তাঁর অভিষেক হয় মণিপুরের বিপক্ষে। সেই ম্যাচের দুই ইনিংসে ৩৫ ও ৯৯ রান করেন সুতার। ব্যক্তিগতভাবে ভালো পারফরম্যান্স করলেও ম্যাচটিতে তিন উইকেটে হেরে যায় মিজোরাম।
নাগাল্যান্ডের বিপক্ষে ৪০০ রানের ইনিংসের মাধ্যমে সেই অভিষেকের পর নিজের সামর্থ্য আরও বড় পরিসরে তুলে ধরলেন তিনি। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাটিং করে ব্যক্তিগত রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি দলের সংগ্রহকেও শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছেন এই ব্যাটার।
রঞ্জি ট্রফির মতো দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রতিযোগিতায় এমন ইনিংস একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সুতারের সামনে এখন এই পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। তবে ৪০০ রানের অপরাজিত ইনিংস তাঁকে ইতিমধ্যেই ভারতের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে।