আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিপক্ষের স্লেজিং বা মানসিক হেনস্তার মুখে অতীতে মাথা নিচু করে থাকার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আক্রমণাত্মক জবাব দেওয়ার সাহসী মানসিকতা ভারতীয় দলে প্রথম ফুটিয়ে তুলেছিলেন সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। ভারতের সাবেক উইকেটরক্ষক ও ব্যাটার দীপ দাশগুপ্ত সম্প্রতি একটি টেলিভিশন শোতে এমন মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, বিদেশের মাটিতে আজকের যে নির্ভীক ও অদম্য ভারতীয় দল আমরা দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সেই সময়ের ‘মহারাজ’।
দূরদর্শনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ক্রিকেট শো’-তে কথা বলতে গিয়ে ভারতের হয়ে আটটি টেস্ট ও পাঁচটি ওয়ানডে খেলা দীপ দাশগুপ্ত সৌরভের অধিনায়কত্বের সোনালী দিনগুলো স্মরণ করেন। তিনি জানান, নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ বা তারও আগের ভারতীয় দলে প্রতিপক্ষের কথার লড়াইয়ে নিজেদের ক্ষোভ ও রাগ সাধারণত ভেতরেই চেপে রাখার প্রথা ছিল। খেলোয়াড়রা মনে করতেন, মাঠের বাইরের বা ভেতরের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের জবাব কেবল ব্যাট বা বল দিয়েই দিতে হবে। কিন্তু সৌরভ গাঙ্গুলি অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই রক্ষণশীল ধারণায় বড় ধাক্কা লাগে। তিনি দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে এই বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন যে, প্রতিপক্ষ স্লেজিং করলে চুপচাপ সহ্য করার কোনো মানে নেই; বরং মাঠে সমানতালে চোখে চোখ রেখে পাল্টা জবাব দিতে হবে।
সৌরভ গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বের পরিসংখ্যানও ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। সব মিলিয়ে তিনি ভারতের হয়ে ১৯৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যার মধ্যে জয় এসেছে ৯৭টিতে এবং পরাজয় ৭৯টিতে, আর ১৫টি ম্যাচ ড্র হয়েছিল। বিশেষ করে টেস্ট ফরম্যাটে তাঁর সাফল্য ছিল দুর্দান্ত। ৪৯টি টেস্টে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ২১টিতে জয় এনে দেন, যেখানে পরাজয় ছিল ১৩টিতে এবং ১৫টি ম্যাচ ড্র হয়। তাঁর এই অকুতোভয় মানসিকতার সুফল পরবর্তী সময়ে মহেন্দ্র সিং ধোনি এবং বিরাট কোহলির মতো পরবর্তী প্রজন্মের অধিনায়কদের হাত ধরে আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
দীপ দাশগুপ্তের মতে, ২০০১ সালের ঘরের মাঠে ঐতিহাসিক অস্ট্রেলিয়া সিরিজ থেকে শুরু করে ২০০৩-০৪ সালের অস্ট্রেলিয়া সফর—এই সময়ের ব্যবধানে ভারতীয় দলের ব্যক্তিত্ব ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে এক দৃশ্যমান ও স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছিল। আগে যেখানে নিয়ন্ত্রিত ও আত্মগোপনকারী মনোভাব কাজ করত, সেখানে সৌরভের ছোঁয়ায় দল হয়ে ওঠে আগ্রাসী ও আত্মবিশ্বাসী। নিজের নামের সার্থকতা প্রমাণ করে সৌরভ যেভাবে মাঠে নেতৃত্ব দিতেন, সেই রাজসিক বিশ্বাস ও অদম্য মনোভাব পুরো দলের ড্রেসিংরুমেও সংক্রমিত হয়েছিল।
সৌরভ গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বেই ভারতীয় ক্রিকেট দল বিশ্বমঞ্চে নতুন এক উচ্চতা স্পর্শ করেছিল। তাঁর নেতৃত্বে দল ২০০৩ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে রানার্সআপ হয়েছিল। এ ছাড়া ইংল্যান্ডের মাটিতে ঐতিহাসিক ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জয়, ২০০২ সালে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যৌথভাবে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয় এবং ঘরের মাঠে পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে স্মরণীয় বর্ডার-গাভাস্কার সিরিজ জয়ের কীর্তি গড়েন তিনি। একই সঙ্গে হেডিংলির লিডস ও অ্যাডিলেডে স্মরণীয় টেস্ট জয়ের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে জেতার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। সৌরভের সেই সাহসী ও আপসহীন নেতৃত্বই ভারতীয় ক্রিকেটকে বিশ্বমঞ্চে এক সমীহজাগানি শক্তিতে পরিণত করেছিল।