বৃহস্পতিবার ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে এই স্মরণীয় জয় তুলে নেয় শ্রীলঙ্কা। ম্যাচের শেষ ওভারে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৮ রান। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে পঞ্চম বলে ইংল্যান্ডের পেসার জশ টংকে লং-অফের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন জানিথ লিয়ানাগে। তাঁর সেই ছক্কায় শেষ হয় রুদ্ধশ্বাস লড়াই, উল্লাসে মেতে ওঠেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা।
ম্যাচটিতে দুই দলের সম্মিলিত সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮৫৯ রান। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এক ম্যাচে দুই দলের মিলিয়ে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান। ব্যাটিংয়ের এমন প্রদর্শনীর পরও শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় ইংল্যান্ডকে।
এর আগে ব্যাট করতে নেমে অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের বিধ্বংসী ইনিংসে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৪ উইকেটে ৪২৯ রান সংগ্রহ করে ইংল্যান্ড। ইনিংসের শুরুতে অবশ্য বেশ সতর্ক ছিলেন ব্রুক। প্রথম ২৪ বলে তাঁর ব্যাট থেকে আসে মাত্র ১৩ রান। কিন্তু উইকেটে থিতু হওয়ার পর পাল্টে যায় ব্যাটিংয়ের ধরন। একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকিয়ে প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন তিনি।
মাত্র ৭৫ বলে শতক পূর্ণ করার পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন ইংলিশ অধিনায়ক। শেষ পর্যন্ত ১১৪ বলে দ্বিশতকের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। ইংল্যান্ডের ওয়ানডে ইতিহাসে কোনো ব্যাটারের এটিই প্রথম দ্বিশতক। একই সঙ্গে দ্রুততম দ্বিশতকের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন ব্রুক।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এর আগে গত মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১১৭ বলে দ্বিশতক করেছিলেন ভারতের শুভমান গিল। সেই রেকর্ড তিন বল কম খেলে ছাড়িয়ে যান ব্রুক।
ইংল্যান্ডের ৪২৯ রান ওয়ানডে ক্রিকেটে দলটির চতুর্থ সর্বোচ্চ সংগ্রহ। বিদেশের মাটিতে টেস্ট খেলুড়ে কোনো দেশের বিপক্ষে এটিই ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ওয়ানডে সংগ্রহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এত বড় সংগ্রহ নিয়েও যে পরাজিত হতে হবে, তা হয়তো ভাবেননি ইংলিশ ক্রিকেটাররা।
৪৩০ রানের কঠিন লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে শ্রীলঙ্কা। দলীয় মাত্র ২৪ রানে দুই ওপেনারকে হারিয়ে চাপে পড়ে যায় তারা। এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ইংল্যান্ডের দিকে চলে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেখান থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন পবন রথনায়েকে ও অবিষ্কা ফার্নান্দো।
চার নম্বরে ব্যাট করতে নেমে দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেন রথনায়েকে। ইংল্যান্ডের বোলারদের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ১০৬ বলে ১৩০ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ১৫টি চার ও তিনটি ছক্কা। কঠিন পরিস্থিতিতে এমন ইনিংস শ্রীলঙ্কাকে শুধু ম্যাচেই ফেরায়নি, বিশাল লক্ষ্য অর্জনের আত্মবিশ্বাসও জুগিয়েছে।
অন্যদিকে অবিষ্কা ফার্নান্দো ৯৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। শতকের খুব কাছে গিয়ে থামলেও দলের রান তাড়ায় তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরপর দাসুন শানাকাও ব্যাট হাতে অসাধারণ দৃঢ়তার পরিচয় দেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে আরও ৯৭ রান।
রথনায়েকে, ফার্নান্দো ও শানাকার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ম্যাচের সমীকরণ ধীরে ধীরে শ্রীলঙ্কার অনুকূলে আসতে থাকে। বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় রান তোলার গতি ধরে রাখেন লঙ্কান ব্যাটাররা। উইকেট হারানোর চাপ সামলেও আক্রমণাত্মক ব্যাটিং থেকে সরে আসেননি তাঁরা।
শেষদিকে ম্যাচের উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। জয়-পরাজয়ের সমীকরণ গড়ায় শেষ ওভারে। তখনও প্রয়োজন ৮ রান। এমন পরিস্থিতিতে স্নায়ুচাপ সামলে গুরুত্বপূর্ণ ছক্কা হাঁকান জানিথ লিয়ানাগে। তাঁর ব্যাট থেকেই আসে জয়সূচক রান।
অসাধারণ ১৩০ রানের ইনিংসের জন্য ম্যাচসেরার পুরস্কার পান পবন রথনায়েকে।
ওয়ানডে ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে এই জয় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ৪৩০ রানের লক্ষ্য সফলভাবে তাড়া করে শ্রীলঙ্কা উঠে এসেছে সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে।
এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪৩৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল প্রোটিয়ারা। সেই ম্যাচটি এখনো ওয়ানডে ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় লড়াই হিসেবে বিবেচিত।
দুই দলের সম্মিলিত রানের ক্ষেত্রেও দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার সেই ম্যাচটি শীর্ষে রয়েছে। ২০০৬ সালের ওই ম্যাচে দুই দল মিলে করেছিল ৮৭২ রান। ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার এবারের লড়াইয়ে হয়েছে ৮৫৯ রান, যা ওই রেকর্ডের চেয়ে মাত্র ১৩ রান কম।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জন্য ম্যাচটি হয়ে থাকল চরম হতাশার। অধিনায়কের ঐতিহাসিক দ্বিশতক এবং চার শতাধিক রানের সংগ্রহের পরও জয় নিশ্চিত করতে পারেনি দলটি। বিশেষ করে অভিজ্ঞ স্পিনার আদিল রশিদের অনুপস্থিতিতে ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণ শ্রীলঙ্কার ব্যাটারদের সামনে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।
বড় সংগ্রহ গড়ার পরও প্রতিপক্ষের রান তাড়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার মূল্য দিতে হয়েছে ইংল্যান্ডকে। অন্যদিকে শুরুতে দুই উইকেট হারিয়েও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা দেখিয়েছে শ্রীলঙ্কা।
হ্যারি ব্রুকের ব্যক্তিগত রেকর্ডের জন্য ম্যাচটি যেমন স্মরণীয়, তেমনি শ্রীলঙ্কার অসাধারণ দলীয় পারফরম্যান্সও জায়গা করে নিয়েছে ক্রিকেট ইতিহাসে। বিশাল লক্ষ্য, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা মিলিয়ে ম্যাচটি ওয়ানডে ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত রান তাড়ার উদাহরণ হয়ে থাকল।