শ্রীলঙ্কা সফর থেকে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ১-০ ব্যবধানে জিতে ফিরেছে ভারতীয় দল। গলে সিরিজের প্রথম টেস্টটি সহজেই নিজেদের করে নিয়েছিল সফরকারীরা। তবে কলম্বোর রানপ্রসূ উইকেটে দ্বিতীয় টেস্ট নিশ্চিত জয়ের কাছে গিয়েও ড্র হওয়ায় হতাশ দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। প্রথম ইনিংসে বিশাল রানের পাহাড় গড়ে প্রতিপক্ষকে ফলো-অন করানোর পরও অলআউট করতে না পারার এই ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছেন না সাবেক ব্যাটার মোহাম্মদ কাইফ। তরুণ দলের মানসিকতা ও মাঠে আগ্রাসী ভাবমূর্তির অভাব নিয়ে তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন।
ম্যাচের গতিপ্রকৃতি পুরোটাই ছিল ভারতের নিয়ন্ত্রণে। সফরকারী ব্যাটারদের সাবলীল ব্যাটিংয়ে কলম্বো টেস্টের প্রথমার্ধেই চালকের আসনে বসে পড়ে তারা। তরুণ ওপেনার দেবদূত পাড্ডিকালের সাবলীল ১১৭ রান এবং ধ্রুব জুরেলের দায়িত্বশীল অপরাজিত ১১৫ রানের দুর্দান্ত দুই শতকে ভর করে ভারত ৯ উইকেটে ৫০৩ রান তুলে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে। জবাবে শ্রীলঙ্কা নিজেদের প্রথম ইনিংসে চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে। দিনুশার একক লড়াইয়ের ১০৩ রানের ওপর ভর করে স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংস গুটায় মাত্র ২৯০ রানে। ফলে ২১৩ রানের বড় ব্যবধানে এগিয়ে থেকে শ্রীলঙ্কাকে দ্বিতীয়বার ব্যাটিং বা ফলো-অন করানোর সিদ্ধান্ত নেন ভারতীয় অধিনায়ক শুভমান গিল।
তবে ম্যাচের শেষ ইনিংসে চিত্রপট পুরোপুরি বদলে যায়। জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ১০টি উইকেট তুলে নিতে ভারতীয় বোলার ও ফিল্ডাররা স্বাগতিকদের ওপর কাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরি করতে পারেননি। প্রথম ইনিংসের শতক হাঁকানো দিনুশাই আবার ভারতীয় বোলারদের জন্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। দ্বিতীয় ইনিংসেও তিনি অপরাজিত ১৩৩ রানের এক অসাধারণ ইনিংস উপহার দেন। তার সাথে মিডল অর্ডারের অন্যান্য ব্যাটারদের দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাওয়ার মানসিকতায় ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ড্রয়ে পরিণত হয়। নিশ্চিত জয়ের এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষকদের ক্ষোভের মুখোমুখি হতে হচ্ছে দলকে।
ভারতের হয়ে ১৩৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা সাবেক ব্যাটার মোহাম্মদ কাইফ এই ফল নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন। তার মতে, লাল বলের ক্রিকেটে সাফল্য কেবল স্পিন সহায়ক উইকেট বা একক দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; সেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মাঠে শারীরিক উপস্থিতি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে পিষে ফেলার মানসিকতা। অধিনায়ক শুভমান গিল ও সিনিয়র ব্যাটার লোকেশ রাহুলের নেতৃত্ব ও মাঠের শরীরী ভাষা তাকে হতাশ করেছে।
কাইফ মনে করেন, ড্রেসিংরুমে বিরাট কোহলির মতো এক প্রভাবশালী ও শক্ত ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতি এই ম্যাচে মারাত্মকভাবে টের পাওয়া গেছে। কোহলি যখন ফিল্ডিং করেন, তখন প্রতিনিয়ত চিৎকার করে চারপাশের সতীর্থদের উজ্জীবিত রাখেন এবং ব্যাটারের মধ্যে একধরনের ভীতি তৈরি করেন। কিন্তু কলম্বোয় ভারতীয় খেলোয়াড়দের অত্যন্ত হালকা মেজাজে দেখা গেছে। তারা ভেবে নিয়েছিল যে বল যেহেতু টার্ন করছে, তাই উইকেট এমনিতেই চলে আসবে।
প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কার ওপর বিন্দুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি না করা এবং ব্যাটার দিনুশাকে মানসিকভাবে চটানোর কোনো উদ্যোগ না দেখায় হতাশা প্রকাশ করেন কাইফ। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, মহেন্দ্র সিং ধোনি কিংবা রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মতো কিংবদন্তিরা যখন ক্রিজে থাকা প্রতিপক্ষ ব্যাটারের দিকে চোখ তুলে তাকাতেন, তখনই অর্ধেক কাজ হয়ে যেত। কিন্তু এই ম্যাচে লঙ্কানদের কোনো অস্বস্তিতেই ফেলতে পারেনি ভারতের বর্তমান তরুণ দল। কাইফের বার্তা খুব স্পষ্ট—অভিজ্ঞতার ঘাটতি যেমনই থাক, মাঠে নামলে জয় ছিনিয়ে আনার সেই চিরচেনা তীব্র আগ্রাসন শুভমান গিলদের ফেরাতেই হবে।