অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে স্বাগতিকদের বিপক্ষে চার দিনের লাল বলের টেস্ট ম্যাচে এক অবিশ্বাস্য ও স্মরণীয় জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। ম্যাচের প্রতিটি দিন তো বটেই, এমনকি খেলা গড়ানো মোট ১১টি সেশনের সব কটিতেই ক্যাঙ্গারু বাহিনীকে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে চেপে ধরে রেখেছিলেন টাইগার ব্যাটার ও বোলাররা। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে এভাবে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে হারানো বাংলাদেশ ক্রিকেট তথা এশীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অনন্য নতুন মাইলফলক। অপ্রত্যাশিত ও শোচনীয় এই পরাজয়ের পর কোনো অজুহাত বা পিচের কন্ডিশনের দোহাই না দিয়ে প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্বকে খোলা মনে মেনে নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম অভিজ্ঞ ব্যাটার ও সাবেক অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের হারের পুঙ্খানুপুঙ্খ ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে স্মিথ বেশ স্পষ্টভাষাতেই নিজেদের টেকনিক্যাল ও মানসিক ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ম্যাচের একদম প্রথম সেশন থেকেই বাংলাদেশ যেভাবে সুপরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ক্রিকেট খেলেছে, অজি দল তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। ডারউইনের পিচে প্রথম দিন সকালের কন্ডিশনকে দারুণ দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে টাইগার বোলাররা যে নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, তা সামলাতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইনআপে বড় ধরনের ধস নামে। স্বাগতিক ব্যাটারদের আত্মতুষ্টি আর কৌশলগত ভুলের সুযোগ নিয়ে পুরো ম্যাচের রাশ শুরুতেই নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় সফরকারীরা।
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং পারফরম্যান্সকে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মূল মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন স্মিথ। টাইগার ব্যাটারদের ধৈর্যশীল ও পরিস্থিতি উপযোগী ব্যাটিং সফরকারীদের জন্য একটি বিশাল সংগ্রহের মজবুত ভিত গড়ে দেয়, যা পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার জন্য মস্ত বড় এক রানের পাহাড়ে পরিণত হয়। পাহাড়সম এই রানের বোঝা মাথায় নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে খেলতে নেমে ক্যাঙ্গারু ব্যাটাররা চরম মানসিক চাপে পড়েন। অজি মিডল অর্ডারে তরুণ অলরাউন্ডার ক্যামেরন গ্রিন একাই লড়াই চালিয়ে চমৎকার একটি সেঞ্চুরি হাঁকালেও অন্য প্রান্ত থেকে তিনি ন্যূনতম সহায়তাটুকু পাননি। টপ ও মিডল অর্ডারের বেশ কয়েকজন ব্যাটার উইকেটে থিতু হয়েও অপ্রয়োজনীয় ও দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলে নিজেদের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন।
কন্ডিশন ও ম্যাচের জটিল সমীকরণ বিশ্লেষণ করে সাবেক এই অজি অধিনায়ক জানান, এই উইকেটে বড় রান তোলা খুব একটা কঠিন ছিল না, যা বাংলাদেশ প্রমাণ করে দিয়েছে। ম্যাচে টিকে থাকতে হলে দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার অন্তত ২০০ বা তার বেশি রানের লিড প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ ও ক্ষুরধার বোলিং আক্রমণের সামনে স্বাগতিকদের প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। টানা চার দিন ধরে ক্রিকেটের তিনটি বিভাগেই—ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—বাংলাদেশ যেভাবে পেশাদারিত্ব দেখিয়েছে, তাতে তাদের এই জয়কে শতভাগ প্রাপ্য বলেই মনে করেন অজিদের এই নির্ভরযোগ্য ব্যাটার।
অবশ্য একটি ম্যাচে এমন লণ্ডভণ্ড পারফরম্যান্স ও বাজেভাবে হারলেও নিজেদের মানসিক শক্তিতে ধাক্কা লাগতে দিচ্ছেন না এই অভিজ্ঞ অজি তারকা। তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার অর্জনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে লাল বলের ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ও দলগত দক্ষতার বলেই বিশ্ব ক্রিকেটের শীর্ষে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে অস্ট্রেলিয়া। ডারউইনের এই চরম ব্যর্থতাকে স্রেফ একটি ‘বাজে সপ্তাহ’ বা সাময়িক অফ-ডে হিসেবে আখ্যা দিয়ে স্মিথ আশা প্রকাশ করেন, এই হারের ভুলগুলো থেকে দ্রুত শিক্ষা নিয়ে সফরকারী দলের বিরুদ্ধে পরবর্তী সিরিজে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়াবে তাঁর দল।
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার কঠিন ও অচেনা কন্ডিশনে গিয়ে ঘরের মাঠের সিংহদের এভাবে টানা চার দিন ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়ে অবিস্মরণীয় জয় উপহার দেওয়া বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্ব এখন নতুন করে ও অত্যন্ত সমীহের চোখে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। টাইগারদের এই ঐতিহাসিক সাফল্য দেশের তরুণ ক্রিকেটারদের আগামী দিনে বিদেশের মাটিতে ভালো খেলার দারুণ অনুপ্রেরণা জোগাবে।