বাংলাদেশ-ধাক্কার পর অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট কাটার শঙ্কা

ডারউইনে বাংলাদেশের কাছে প্রথম টেস্টে নয় উইকেটের বড় ব্যবধানে হারের ক্ষত এখনও শুকায়নি অস্ট্রেলিয়ার। এর মধ্যেই দলটির সামনে দেখা দিয়েছে আরেকটি উদ্বেগ—ধীরগতির ওভার রেট। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ওভার শেষ করতে না পারায় অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্টের হিসাবের কারণে।

ডারউইনে অনুষ্ঠিত ম্যাচের চতুর্থ দিনে বাংলাদেশের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া লক্ষ্য অতিক্রম করা। সেই কাজ করতে বাংলাদেশকে হারাতে হয়েছে মাত্র একটি উইকেট। ফলে স্বাগতিক দলের বিপক্ষে নয় উইকেটের জয় তুলে নিয়ে বাংলাদেশ শুধু ঐতিহাসিক সাফল্যই পায়নি, অস্ট্রেলিয়ার জন্যও তৈরি করেছে বড় ধরনের চাপ।

ম্যাচজুড়ে বাংলাদেশের বোলাররা নিয়ন্ত্রিত লাইন ও লেংথে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের আটকে রাখেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যাটাররা প্রয়োজনের সময় ধৈর্য দেখিয়ে রান সংগ্রহ করেন। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ দিনেই ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়ে যায়।

এর পরই আলোচনায় এসেছে অস্ট্রেলিয়ার ওভার রেট। ম্যাচের তৃতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়া ৮৬ ওভার বল করেছিল। নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী তাদের ৯০ ওভার শেষ করার কথা ছিল। অর্থাৎ দিনের শেষে চার ওভার ঘাটতি থেকে যায়।

টেস্ট ক্রিকেটে সাধারণভাবে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১৫ ওভার করার লক্ষ্য থাকে। পূর্ণ দিনের হিসাবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০ ওভার। কোনো দল নির্ধারিত হারের চেয়ে পিছিয়ে পড়লে ম্যাচ রেফারি বিষয়টি পর্যালোচনা করেন। তবে কতটা শাস্তি দেওয়া হবে, তা নির্ধারণের আগে ম্যাচের সামগ্রিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।

সম্ভাব্য শাস্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্টে। নিয়ম অনুযায়ী, ধীরগতির ওভার রেটের জন্য একটি দলকে পয়েন্ট হারাতে হতে পারে। একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফির একটি অংশ জরিমানা হিসেবেও কেটে নেওয়ার বিধান রয়েছে। প্রতি ঘাটতি ওভারের জন্য ম্যাচ ফির সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার সুযোগ রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার একজন খেলোয়াড়ের টেস্ট ম্যাচ ফি ২০ হাজার মার্কিন ডলার ধরে হিসাব করলে চার ওভারের ঘাটতিতে সর্বোচ্চ জরিমানা হতে পারে জনপ্রতি ৪ হাজার ডলার। একাদশের ১১ খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অঙ্ক দাঁড়াতে পারে ৪৪ হাজার ডলারে। তবে এটি কেবল সর্বোচ্চ সম্ভাব্য হিসাব। প্রকৃত জরিমানার পরিমাণ নির্ভর করবে ম্যাচ রেফারি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান হিসাবেও বিষয়টি অস্ট্রেলিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারা ৮৪ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে এবং জয়ের হার ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। যদি চার পয়েন্ট কাটা হয়, তাহলে তাদের পয়েন্ট কমে ৮০-তে নেমে যাবে। তবে জয়ের হার অপরিবর্তিত থাকবে, কারণ এই হার সরাসরি মোট পয়েন্টের ভিত্তিতে নয়; ম্যাচের ফলের ওপর নির্ভর করে তা নির্ধারিত হয়।

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৬ পয়েন্ট ও ৭৫ শতাংশ জয়ের হার নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশও নিজেদের অবস্থান উন্নত করেছে। তাদের পয়েন্ট এখন ৪০ এবং জয়ের হার ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যা তাদের তালিকার চতুর্থ স্থানে নিয়ে গেছে।

তবে ওভার রেট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক ছিল না। প্রথম ইনিংসে নির্ধারিত হারের তুলনায় বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়ে ছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ৫৩ ওভারে অলআউট করে দেওয়ার কারণে হিসাবের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। ওভার রেটের শাস্তি নির্ধারণের সময় একটি দল কতক্ষণ মাঠে ছিল, ইনিংস কত দ্রুত শেষ হয়েছে এবং কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে সময় নষ্ট হয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ থাকে।

ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস ১৩৮ ওভার পর্যন্ত গড়িয়েছিল। ফলে অস্ট্রেলিয়ার চার ওভারের ঘাটতি চূড়ান্ত শাস্তিতে রূপ নেবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। শুধু ঘাটতি ওভারের সংখ্যা দেখেই শাস্তি নির্ধারিত হয় না। আবহাওয়াজনিত বিরতি, চোট, খেলার অন্যান্য বিলম্ব, পর্যালোচনা বা মাঠের এমন কোনো পরিস্থিতি ছিল কি না, যার কারণে সময় ব্যয় হয়েছে—এসবও কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় আসতে পারে।

ধীরগতির ওভার রেটের কারণে শাস্তি পাওয়া অস্ট্রেলিয়ার জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০২০ সালের বক্সিং ডে টেস্টেও দলটির বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চার পয়েন্ট কেটে নেওয়া হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণে এবারও বিষয়টি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার টিম ম্যানেজমেন্টের সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

ডারউইনের পরাজয় তাই অস্ট্রেলিয়ার জন্য কেবল একটি টেস্ট ম্যাচ হারার ঘটনা নয়। মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে শৃঙ্খলা ও ওভার রেটের বিষয়টি। বিশেষ করে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্টের লড়াই যত এগোবে, প্রতিটি পয়েন্টের গুরুত্বও তত বাড়বে।

সিরিজের পরবর্তী ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য হবে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে নিজেদের শক্তি প্রমাণ করা। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওভার শেষ করাও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি জয় যেমন হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে, তেমনি সম্ভাব্য পয়েন্ট কর্তনের ঝুঁকি এড়াতে ওভার রেটের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন হবে।

মন্তব্য করুন